যে শহরে মৃত্যু নিষিদ্ধ!

পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের স্থায়ী শহর লংইয়ারবিয়েন
ভাবুন তো, পৃথিবীর এক প্রান্তে এমন এক শহরের কথা, যেখানে আইন করে মৃত্যু নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এমন শহর সত্যি আছে। পৃথিবীর উত্তর প্রান্তের বরফে মোড়া এক শহরে আইন করে একরকম মৃত্যুকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এ শহরে কেউ মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছালে বা গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে সাধারণত নরওয়ের মূল ভূখণ্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু যতই আইন করা হোক মৃত্যু অমোঘ। তাকে কি সত্যি ঠেকানো যায়? যায় না। যদি কোনো কারণে শহরে কারও মৃত্যু ঘটে, তাহলে মরদেহ বিমান বা জাহাজে করে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানেই সম্পন্ন হয় শেষকৃত্য।
স্বাগতম লংইয়ারবিয়েনে।
উত্তর মেরুর দিকে যত এগোবেন, পৃথিবী তত বদলে যেতে শুরু করবে। গাছপালা হারিয়ে যাবে, দীর্ঘ হবে রাত, ছোট হবে দিন। তারপর একসময় পৌঁছে যাবেন সভালবার্দ দ্বীপপুঞ্জে। নরওয়ের মূল ভূখণ্ড আর উত্তর মেরুর মাঝামাঝি অবস্থিত বরফাচ্ছন্ন এক দ্বীপমালায়।
সেখানেই রয়েছে লংইয়ারবিয়েন, পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের স্থায়ী শহর। জনসংখ্যা মেরেকেটে আড়াই হাজার। চারদিকে পাহাড়, হিমবাহ, তুষার আর বরফে ঘেরা এই ছোট্ট শহরটিতে একসময় ছিল কয়লাখনি। এখন এটি সভালবার্দের প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র, গির্জা, জাদুঘর, রেডিও স্টেশন, ডাকঘর সবকিছুর দেখা মিলবে এখানে। কিন্তু শহরটিকে বিখ্যাত করেছে অন্য একটি বিষয়।
এখানে কবর দেওয়া নিষিদ্ধ।
কেন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে মাটির নিচে।
লংইয়ারবিয়েনের মাটি বছরের অধিকাংশ সময় জমাট বরফে আবদ্ধ থাকে। এই স্থায়ী জমাট মাটিকে বলা হয় পারমাফ্রস্ট। সাধারণত পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে মৃতদেহ মাটির নিচে ধীরে ধীরে পচে মিশে যায় প্রকৃতির সঙ্গে। কিন্তু লংইয়ারবিয়েনে সেই প্রক্রিয়া প্রায় থেমে যায়।
ফলে সমাধিস্থ দেহগুলো অস্বাভাবিকভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় থেকে যেতে পারে বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত।
এই বিষয়টি আলোচনায় আসে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারিতে মারা যাওয়া কয়েকজনকে লংইয়ারবিয়েনে সমাহিত করা হয়েছিল। বহু বছর পরে গবেষকেরা দেখতে পান, জমাট মাটির কারণে তাদের দেহাবশেষে ভাইরাসের জিনগত উপাদানের কিছু অংশ এখনো শনাক্ত করা সম্ভব।
এতে আশঙ্কা তৈরি হয়, এই শহরে বিপজ্জনক জীবাণু বা রোগজীবাণু দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত থাকতে পারে। যদিও আধুনিক গবেষণা বলছে, কবর নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পেছনে জনস্বাস্থ্য যেমন একটি কারণ, তেমনি জমাট মাটির কারণে স্বাভাবিক কবরস্থান পরিচালনার বাস্তব সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ফলে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় এখানে আইন করে ‘মৃত্যু’ নিষিদ্ধ করা হয়। তবে সেটা তো ঠেকানো সম্ভব হয় না পুরোপুুরি। কার্যত শহরে নতুন করে কাউকে সমাহিত করা বন্ধ হয়ে যায়।
তবে শহরে একটি পুরোনো কবরস্থান এখনো আছে। সেটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেখানে নতুন কবর দেওয়া হয় না।
অদ্ভুত নিয়মের এখানেই শেষ নয়।
লংইয়ারবিয়েনে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থাও সীমিত। শহরের ছোট হাসপাতালটি সাধারণ চিকিৎসা দিতে পারলেও জটিল চিকিৎসা বা প্রসবসেবা দেওয়ার মতো পূর্ণাঙ্গ সুবিধা নেই। তাই গর্ভবতী নারীদের সম্ভাব্য প্রসবের কয়েক সপ্তাহ আগে নরওয়ের মূল ভূখণ্ডে চলে যেতে বলা হয়।
তবু প্রকৃতি তো সব সময় ক্যালেন্ডার দেখে চলে না। তাই মাঝেমধ্যে নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশুর জন্ম হয়ে যায় এখানেও।
বরফের দেশে টিকে থাকতে হলে ঘরবাড়িও বানাতে হয় ভিন্নভাবে। লংইয়ারবিয়েনের অনেক ভবন খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কারণ গ্রীষ্মকালে মাটির ওপরের বরফের স্তর কিছুটা গলতে শুরু করে। ভবনের উষ্ণতা সরাসরি মাটিতে ছড়িয়ে পড়লে জমাট মাটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই ঘরবাড়িকে মাটি থেকে কিছুটা উঁচু করে নির্মাণ করা হয়।
শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়বে। এখানে বিড়াল পোষা কার্যত নিষিদ্ধ। কারণ সভালবার্দ দ্বীপপুঞ্জ অসংখ্য সামুদ্রিক পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। বিড়াল শিকারি প্রাণী হওয়ায় তারা স্থানীয় পাখিদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এই বিধিনিষেধ।
তবে বিড়াল না থাকলেও অন্য প্রাণীর অভাব নেই। বরং এমন এক প্রাণী আছে, যার কারণে শহরের বাইরে বের হলে অনেককে সঙ্গে অস্ত্র নিতে হয়। সেটা মেরু ভালুক।
সভালবার্দে মানুষের চেয়ে মেরু ভালুকের সংখ্যা প্রায় সমান বা অনেক সময় বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়। দ্বীপপুঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তারা বিচরণ করে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অস্ত্র বহনে কড়াকড়ি থাকলেও জনবসতি ছাড়িয়ে বাইরে গেলে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বা সংকেত দেওয়ার বিশেষ সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে উৎসাহিত করা হয়।
অবশ্য শহরের রাস্তায় নেমেই যে মেরু ভালুকের মুখোমুখি হতে হবে, এমন নয়। তাদের দেখা পাওয়া বেশ বিরল ঘটনা। তুলনায় বল্গা হরিণ আর মেরু শিয়ালের দেখা অনেক বেশি মেলে।
তবে লংইয়ারবিয়েনের সবচেয়ে নাটকীয় অভিজ্ঞতা হয়তো প্রাণীদের নয়, সূর্যের।
প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ দিকে সূর্য দিগন্তের নিচে হারিয়ে যায়। তারপর টানা কয়েক মাস আর দেখা মেলে না তার।
নেমে আসে মেরুর দীর্ঘ অন্ধকার। এই সময়কে বলা হয় পোলার নাইট বা মেরু রজনী। দিনের বেলাতেও সূর্য ওঠে না। আকাশে শুধু নীলচে আলো, চাঁদ, তারা আর কখনো কখনো সবুজ-নীল অরোরা নৃত্য করে।
আবার বসন্তের শুরুতে যখন সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে শহরে ফিরে আসে, তখন সেটি উৎসবের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। মার্চ মাসে স্থানীয়রা সূর্যকে স্বাগত জানাতে বিশেষ আয়োজন করে। কয়েক মাসের অন্ধকার শেষে সূর্যের প্রত্যাবর্তন এখানে শুধু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এক ধরনের আবেগও।
আরও একটি পুরোনো অভ্যাস আজও টিকে আছে শহরটিতে। অনেক হোটেল, জাদুঘর, অফিস কিংবা কিছু রেস্তোরাঁয় ঢোকার আগে মানুষ জুতা খুলে রাখে। কারণ একসময় লংইয়ারবিয়েন ছিল খনিশ্রমিকদের শহর। চারপাশে উড়ত কয়লার ধুলো। ঘরের ভেতর সেই ধুলো নিয়ে ঢোকা ঠেকাতেই শুরু হয়েছিল এই রীতি। কয়লাখনির যুগ প্রায় শেষ হলেও অভ্যাসটি রয়ে গেছে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে।
শহরটিকে দেখলে মনে হয় যেন মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে এক অদ্ভুত সমঝোতা চলছে। এখানে মানুষ প্রকৃতিকে জয় করেনি, বরং তার নিয়ম মেনে বেঁচে থাকতে শিখেছে।
মেরু ভালুকের জন্য সতর্ক থাকতে হয়, সূর্যহীন মাস পার করতে হয়, সন্তান জন্ম দিতে অন্য শহরে যেতে হয়, আর মৃত্যুর পর নিজের শহরেও চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়া যায় না।
পৃথিবীতে অনেক অদ্ভুত শহর আছে। কিন্তু খুব কম শহরই আছে, যেখানে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের নিজের শহরে থাকার অনুমতি পায় না। লংইয়ারবিয়েন সেই বিরল ব্যতিক্রম।
সূত্র: অ্যাটলাস অবস্কিউরা, ভিজিট সভালবার্দ, গভর্নর অব সভালবার্দ, নরওয়েজিয়ান পোলার ইনস্টিটিউট, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, নাসা আর্থ অবজারভেটরি








