পাতাল শহরে যেভাবে কাটে মানুষের জীবন

সাউথ অস্ট্রেলিয়ার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত কুবার পেডি
অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির ভেতর দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে গেলে একসময় মনে হবে, পৃথিবী বুঝি ফুরিয়ে এসেছে। চারদিকে শুধু ধুলোমাখা সমতল, রোদে পুড়ে লাল হয়ে থাকা মাটি আর গরম বাতাস। কোথাও কোনো বড় শহর নেই, নেই সবুজের ছায়া। এমন এক নির্জন ভূখণ্ডে হঠাৎই দেখা মিলবে কুবার পেডির। দূর থেকে দেখে একে খুব সাধারণই মনে হবে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু ঘরবাড়ি, একটি স্কুল, ছোট্ট হাসপাতাল, দু-একটি দোকান আর নিরিবিলি রাস্তা।
কিন্তু কুবার পেডির আসল শহরটা তখনো আপনার চোখে পড়েনি। কারণ এই শহরের অর্ধেকটা কিংবা আরও বেশিটাই মাটির নিচে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। অস্ট্রেলিয়ার এই ছোট্ট শহরের মানুষজন ঘরবাড়ি বানিয়েছে পাহাড়ের ভেতর। মাটির নিচে আছে বসার ঘর, রান্নাঘর, শোবার ঘর, পানশালা, রেস্তোরাঁ, গির্জা, জাদুঘর, এমনকি বিলাসবহুল হোটেলও। বাইরে থেকে যা দেখতে মরুভূমির মতো, তার নিচেই লুকিয়ে আছে মানুষের গড়ে তোলা এক বিশাল পাতাল নগরী।
সাউথ অস্ট্রেলিয়ার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত কুবার পেডির দূরত্ব অ্যাডিলেড থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার। স্টুয়ার্ট মহাসড়ক ধরে গেলে মাঝপথে যে বিরান ভূমির দেখা মেলে, সেখানেই কোথাও এই শহর। গ্রীষ্মে এখানকার তাপমাত্রা প্রায়ই ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। দিনের বেলা মাটি এতটাই গরম হয়ে ওঠে যে দূরের বাতাসও কাঁপতে দেখা যায়। বৃষ্টি কম, গাছপালা নেই বললেই চলে। আর এই ভয়ংকর গরম থেকেই জন্ম কুবার পেডির পাতাল জীবনের।
১৯১৫ সালে একদল স্বর্ণসন্ধানী এই এলাকায় আসেন। তাদের সঙ্গে ছিল ১৪ বছরের একটি ছেলে। বলা হয়, সেই কিশোরই আচমকা মাটির মধ্যে চকচকে রঙিন এক পাথর খুঁজে পায়। সেটিই ছিল ওপাল, রঙধনুর মতো ঝলমলে এক মূল্যবান রত্ন। সেই আবিষ্কারের পর সবকিছু বদলে যায়।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই দূরদূরান্ত থেকে খনিজ সন্ধানীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন এখানে। সবাই এসেছেন ভাগ্য বদলাতে। মরুভূমির বুক জুড়ে শুরু হয় খোঁড়াখুঁড়ি। তৈরি হতে থাকে অসংখ্য গর্ত, সুড়ঙ্গ আর খনি।
কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। ওপাল পাওয়া গেলেও এই গরমে টিকে থাকা কঠিন। দিনের বেলা রোদ এতটাই তীব্র যে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। তখনই খনিজ শ্রমিকেরা বুঝতে পারেন, মাটির নিচে তাপমাত্রা অনেক আরামদায়ক। তাই তারা প্রথমে খনির গর্তেই অস্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে পাহাড়ের ভেতর কেটে বানিয়ে ফেলেন স্থায়ী বাড়ি।
এই ভূগর্ভস্থ বাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ডাগআউট’ নামে। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে ছোট্ট কোনো পাহাড় বা টিলা। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই যেন অন্য এক জগৎ। ঠান্ডা, নীরব আর আশ্চর্য রকম আরামদায়ক। পাথরের দেয়াল কেটে তৈরি করা হয়েছে বড় বড় কক্ষ। কোথাও ঝুলছে ছবি, কোথাও সাজানো সোফা, কোথাও আবার আধুনিক রান্নাঘর।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই বাড়িগুলোতে আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন খুব কম। মাটির নিচে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা প্রায় ২৩ ডিগ্রির আশপাশে থাকে। বাইরে যখন মরুভূমিতে আগুন ঝরছে, তখন পাতালের ঘরে মানুষ দিব্যি আরামে বসে টেলিভিশন দেখছে।
কুবার পেডির মানুষ শুধু বাড়িই বানায়নি, পুরো জীবনটাই নামিয়ে এনেছে পাতালে। এখানে আছে ভূগর্ভস্থ গির্জা। বিশেষ করে সার্বিয়ান অর্থডক্স গির্জাটি দেখলে মনে হয় যেন কোনো প্রাচীন গুহামন্দিরে ঢুকে পড়েছেন। দেয়াল জুড়ে পাথর খোদাইয়ের নকশা, নরম আলো আর গভীর নীরবতা জায়গাটিকে রহস্যময় করে তোলে।
মাটির নিচে আছে ওপাল জাদুঘরও। সেখানে দেখা যায় কীভাবে এই রঙিন পাথর তৈরি হয়, কীভাবে খনি থেকে তোলা হয়, আর কীভাবে মরুভূমির এই জনপদ একসময় পৃথিবীর ওপাল রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল।
কুবার পেডিতে এখনো রয়েছে ৭০টির বেশি ওপাল ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর বেশির ভাগ ওপাল এসেছে এখান থেকেই। কুবার পেডির খনি থেকে এমন কিছু ওপাল পাওয়া গেছে, যেগুলোর বয়স কোটি কোটি বছর। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বহু আগে এই অঞ্চল সমুদ্রের নিচে ছিল। পরে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হয় এই মূল্যবান রত্ন।
শহরটির নামও এসেছে স্থানীয় আদিবাসী ভাষা থেকে। আগে জায়গাটির নাম ছিল স্টুয়ার্ট রেঞ্জ ওপাল ফিল্ড। পরে আদিবাসী শব্দ ‘কুপা পিটি’ থেকে আসে ‘কুবার পেডি’। এর অর্থ ‘সাদা মানুষের গর্ত’। নামটি শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল একেবারে নিখুঁত। কারণ এই শহরের জীবন সত্যিই গর্তকেন্দ্রিক।
তবে কুবার পেডিতে হাঁটাচলার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। ওপালের খোঁজে বছরের পর বছর খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গভীর গর্ত। অসাবধান হলে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। বিশেষ করে রাতে। আর মজার ব্যাপার হলো, এখানকার বিখ্যাত গলফ খেলা হয় সাধারণত রাতেই। দিনের প্রচণ্ড গরম এড়াতে খেলোয়াড়েরা অন্ধকারে জ্বলজ্বলে বল ব্যবহার করেন। তবে সাধারণ গলফ মাঠের মতো এখানে সবুজ ঘাসের আশা করবেন না। পুরো মাঠটাই ধুলোমাখা মরুভূমি। তবু সেটিই পৃথিবীর অন্যতম অদ্ভুত গলফ মাঠ।
কুবার পেডির এই ভিনগ্রহের মতো পরিবেশ হলিউড পরিচালকদেরও মুগ্ধ করেছে। বহু সিনেমার শুটিং হয়েছে এখানে। বিশেষ করে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি আর মরুভূমিভিত্তিক চলচ্চিত্রের জন্য জায়গাটি আদর্শ। ‘ম্যাড ম্যাক্স: বিয়ন্ড থান্ডারডোম’, ‘পিচ ব্ল্যাক’ আর ‘রেড প্ল্যানেট’-এর মতো ছবিতে দেখা গেছে এই শহরকে।
অনেকেই বলেন, কুবার পেডিতে দাঁড়ালে মনে হয় পৃথিবীতে নয়, যেন মঙ্গল গ্রহে আছেন। এই শহরের সবচেয়ে বড় বিস্ময় তাই এর মানুষগুলো। এমন কঠিন পরিবেশেও তারা তৈরি করেছেন এক অনন্য জীবন। মরুভূমির নিচে বাস করেও তারা উৎসব করেন, ব্যবসা চালান, অতিথিদের স্বাগত জানান। প্রতিবছর এখানে বসে ওপাল উৎসব। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা আসেন পাতাল শহরের জীবন কাছ থেকে দেখতে।
আর যদি কখনো কুবার পেডিতে যান, তাহলে এক রাত অবশ্যই কাটাবেন মাটির নিচের কোনো হোটেলে।
ভাবুন তো, বাইরে মরুভূমির তপ্ত বাতাস বইছে, আর আপনি পাহাড়ের ভেতরে খোদাই করা ঠান্ডা এক ঘরে শুয়ে আছেন। চারপাশে নিস্তব্ধতা। মনে হবে যেন পৃথিবীর গভীরে কোথাও হারিয়ে গেছেন।
আর হয়তো ভাববেন, প্রকৃতি যেখানে জীবনকে কঠিন করে তোলে, মানুষ সেখানেই তৈরি করে নতুন পৃথিবী। একটি শহর, যার অর্ধেক আকাশের নিচে। আর বাকি অর্ধেক পৃথিবীর বুকের ভেতরে।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, অ্যাটলাস অবস্কিউরা, অস্ট্রেলিয়া ডটকম, সাউথ অস্ট্রেলিয়া ট্যুরিজম, অ্যামিউজিং প্ল্যানেট












