আড়াই টনের হাতি দিয়ে ক্ষেত চাষ

হাতি দিয়ে নিজের জমিতে লাঙল চষছেন অতুল কর্মকার
আধুনিক যন্ত্রপাতির রোবোটিক শব্দ ছাপিয়ে আসামের এক প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে মাটির বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার শেকড়ঘেঁষা আওয়াজ। কোনো ট্র্যাক্টর বা জোড়া বলদ দিয়ে নয়, একেবারে আড়াই টনের এক বিশাল দাঁতাল হাতি দিয়ে নিজের জমিতে লাঙল চষছেন এক কৃষক। ভারতের আসামের গোলাঘাট জেলার নুমালীগড়ের মরফুলানি এলাকার এই দৃশ্যটি এখন নেটদুনিয়ায় টক অব দ্য টাউন। কৃষক অতুল কর্মকার ও তার পোষা এশিয়ান হাতি ‘মানিক’-এর এই অভিনব জুটির ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হতেই শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। মাহুতের ইশারা আর মানিকের নিখুঁত পদক্ষেপে জমি তৈরির এই ছবি যেমন গ্রামীণ ভারতের আদিম রূপের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনই এটি উসকে দিয়েছে বন্যপ্রাণী অধিকার ও কঠোর আইনি সীমানার পুরোনো বিতর্কগুলো।
কৃষিকাজে হাতির ব্যবহার শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ঐতিহাসিকভাবে এর শিকড় বেশ গভীরে। অতীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম বনাঞ্চলে ভারী কাঠের গুঁড়ি টানা বা পণ্য পরিবহনের প্রধান ভরসা ছিল এই হাতি। এমনকি আসামের ঐতিহাসিক আহোম রাজত্বকাল বা ব্রিটিশ আমলে জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষযোগ্য জমি তৈরির ক্ষেত্রেও হাতির বিশাল শক্তির জুড়ি মেলা ভার ছিল। মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে অতীতে বলদের বিকল্প হিসেবে হাতি দিয়ে বড় লাঙল টানানোর বিক্ষিপ্ত কিছু নজিরের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। তবে বিশাল এই প্রাণীটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং আকাশছোঁয়া খরচের কারণে এটি কখনোই সাধারণ কৃষকদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়নি।
এই ভাইরাল ভিডিওটি একদিকে যেমন মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে এর আইনি দিকটি বেশ কড়া ও জটিল। ভারতে হাতি কেবল একটি বন্যপ্রাণী নয়, এটি দেশটির ‘জাতীয় ঐতিহ্যবাহী প্রাণী’। ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের ‘তফসিল-১’-এ ১৯৭৭ সাল থেকে এশিয়ান হাতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বাঘ বা সিংহের মতোই সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ফলস্বরূপ, অনুমতি ছাড়া হাতি শিকার বা বন্দি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, ভারতে হাতি দিয়ে সার্কাস বা বাণিজ্যিক প্রদর্শনী কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। সেন্ট্রাল জু অথরিটি নিষ্ঠুরতা ও আইনভঙ্গের কারণে প্রায় সব সার্কাসের স্বীকৃতি বাতিল করেছে, আর প্রাণীদের প্রদর্শন নিয়ন্ত্রণ করে অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অব ইন্ডিয়া। অবশ্য ২০০২ সালের সংশোধনীর পর বৈধ ‘মালিকানা পত্র’ থাকলে, কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হাতি সরকারকে ঘোষণা করা হলে, নির্দিষ্ট ও কঠোর নিয়মের অধীনে কেউ কেউ হাতি পুষতে পারেন।
কৃষক অতুল কর্মকার দাবি করছেন, মানিক ও তাঁর মধ্যকার সম্পর্কটি ভালোবাসার এবং হাতিটিকে কোনো জোর করা হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। কৃষিকাজের মতো ভারী ও ক্লান্তিকর কাজে হাতির ব্যবহার আইনের মূল চেতনার পরিপন্থী হতে পারে, কারণ এতে তফসিল-১ভুক্ত এই প্রাণীর ওপর অতিরিক্ত শারীরিক চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সব মিলিয়ে, আসামের এই ঘটনাটি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে এক অদ্ভুত দোলাচল। একদিকে প্রকৃতির এই বিশালাকার ও বুদ্ধিমান সন্তানের সঙ্গে মানুষের নিবিড় বন্ধুত্বের আবেগ, আর অন্যদিকে বন্যপ্রাণী সুরক্ষার কঠোর আইনি বেড়াজাল। ভিডিওর রেশ কেটে গেলেও প্রশ্ন থেকে যায় ঐতিহ্যের এই চর্চা কি আইনের সীমানায় টিকতে পারবে, নাকি প্রকৃতির এই রাজকীয় বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দ থাকবে কেবল সুরক্ষার কড়া চাদর?



