ফলের নাম কাউ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রথম দেখায় অনেকেই বিস্মিত হয়। মনে হয় যেন সবুজ কোনো পিরামিডের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এত ছায়া আর এত মায়া ওখানে। বিশেষ করে গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে ওপরের ডালপালাগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে একটার পর একটা ডাল সমান্তরালে প্রজাপতির মতো ডানা মেলেছে।
নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়ার জন্মভিটা রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দের বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের নান্দনিক পুকুরঘাটে প্রথম দেখা পাই গাছটির। শুনেছি ঢাকার নিউ মার্কেটে ফলের মৌসুমে ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। বাংলাদেেশর পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেট, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এলাকায় প্রচুর দেখা যায়। ভারত, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ চীন, লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে বেশ পরিচিত ফলটি।
অপ্রচলিত টক মিষ্টি স্বাদের মৌসুমি বুনো ফলটি গ্রামবাংলায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও কাউয়া, কাগলিচু, তাহগালা, ক্যাফল, কাও-গোলা বা পাঁচদানা। ইংরেজি নাম Cowa fruit বা Cowa mangosteen। এর বৈজ্ঞানিক নাম Garcinia cowa।
গাছের উচ্চতা ১৫ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। পাতা ও ডালপালা কম থাকলেও ওপরের দিকে ঘন ঝোপের মতো বাড়ে। সাধারণত বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড় বা পরিত্যক্ত জায়গায় দেখা মেলে। শীতের শেষে ফুল ফোটে এবং বর্ষার শেষে ফল পাকে। কাঁচা অবস্থায় সবুজ আর পাকলে হয়ে যায় হলুদ বা কমলা রঙের। পাকা ফলের শাঁস বা কোয়া খাওয়া হয়। লবণ আর মরিচ মেখে খেলে দারুণ লাগে। কেউ কেউ চাটনি করেও খেয়ে থাকেন। পাকা ফল বাদুড় এবং ইঁদুরও খায়। ভেতরে থাকে চার-পাঁচটি বিচি বা বীজ, তাই পাঁচদানা ফল বলেও ডাকেন অনেকেই। খোসা ছড়ালে লিলিপুট টাইপের কমলালেবুর মতো লাগে। শুধু স্বাদেই নয়, গুণেও ভরপুর এই ফল।
প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে আছে শক্তি, ফাইবার, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, আয়রন, ফ্যাট, শর্করা, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক ও কোলেস্টেরল। এতে থাকা ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীর থেকে ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিকেল দূর করে এবং ভাইরাল ফ্লু প্রতিরোধে সাহায্য করে। পটাশিয়াম থাকায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং স্ট্রোক ও হৃরোগের ঝুঁকি কমায়। মাড়ির রোগ, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও মাড়িকেও শক্ত করে। নিয়মিত খেলে উপকার মেলে, মুখের অরুচিভাব বা হঠাৎ করে মুখে রুচি না থাকলে যে কেউ খেতে পারেন।
গাছের বাকল থেকে হলদে আঠা বের হয়। গ্রামবাংলায় প্রচলিত আছে— কাউফল ও তার গাছের ছাল সেদ্ধ করে খেলে খিঁচুনি রোগের উপশম হয়।
ফলের খোসা দিয়ে একসময় বাতি জ্বালানো হতো। বীজ থেেকই চারা জন্মায়। অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু চরম জলাবদ্ধতায় টিকে থাকা কাউগাছ আজকাল গ্রামবাংলা থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে।
লেখক : কৃষিবিদ ও গবেষক




