প্রকৃতি প্রত্যয়
কুরচি

বাংলা একাডেমির সিকিউরিটি ভবন পেরিয়েই দুটি বাঁকের মুখে দেখা মিলবে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড। সেদিন প্রথিতযশা একজন লেখকের মরদেহ বুড়ো বটতলায় এসেছিল সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। অপেক্ষা করছিলাম লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের।
গাছপালা তরুরাজি যেখানে, আমরা আছি সেখানে। সঙ্গে অনেক প্রিয় সহকর্মী, নিসর্গী, প্রকৃতিবিষয়ক সুলেখক এবং বাংলা একাডেমির ফেলো মোকারম হোসেন। দেখামাত্রই বললেন, ‘চলেন দেখাই। নতুন একটা গাছে ফুল ফুটেছে।’ তিনি জানেন আমি সমঝদার লোক। সব কথা মনপ্রাণ ভরে শুনব। যেমন শুনতাম বৃক্ষাচার্য দ্বিজেন শর্মার। ‘আপনাকে গাছের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাই চলুন’— প্রথম দর্শনে মনে হলো পরিচিত কোনো গাছ। মোকারম ভাই ফুলের নাম না জানিয়ে বললেন— ‘গাছের পাতা ছিঁড়ে দেখুন
কুরচি স্থানবিশেষে কুটজ বা গিরিমল্লিকা নামেও পরিচিত। এর ইংরেজি নাম Kurchi, Conessi Tree বা Tellicherry Tree। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Holarrhena pubescens (আগে Holarrhena antidysenterica নামে পরিচিত ছিল)। এটি Apocynaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আয়ুর্বেদশাস্ত্রীয় ও সংস্কৃত নাম ইন্দ্রযব (Indrayava)। এ ছাড়া কুরুক গাছ, গিরিমল্লিকা, হৈমান্তি, লাট্টু, লাটাং, বড় তিতা, কুরুজ, মহাগন্ধ, কোটিশ্বর, সংগ্রাহী ইত্যাদি নামেও পরিচিত।
শিলাইদহ থেকে কলকাতা ফেরার পথে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়া রেলস্টেশন ঘরের পেছনে কুরচি ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, ‘কুরচি, তোমার লাগি পদ্মেরে ভুলেছে অন্যমনা/ যে ভ্রমর, শুনি নাকি তারে কবি করেছে ভর্ৎসনা।/ আমি সেই ভ্রমরের দলে, তুমি অভিজাত্যহীনা,/নামের গৌরবহারা; শ্বেতভুজা ভারতীয় বীণা/তোমারে করেনি অভ্যর্থনা অলংকারঝংকারিত কাব্যের মন্দিরে। তবু সেথা তব স্থান অবারিত, বিশ্বলক্ষ্মী করেছেন নিমন্ত্রণ যে প্রাঙ্গণতলে/প্রসাদচিহ্নিত তার নিত্যকার অতিথির দলে।’
গিরি মানে পাহাড়। তাই বুঝি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যের ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’ কবিতায় ফুলটির নাম দিয়েছিলেন গিরিমল্লিকা। লিখেছিলেন, ‘আনন্দ-সুন্দর তব মধুর পরশে/অগ্নি-গিরি গিরিমল্লিকার ফুলে ফুলে/ছেয়ে গেছে! জুড়ায়েছে সব দাহজ্বালা!’
মহাকবি কালিদাসের কাব্যে আবার এ ফুলের নাম কূটজ। কবি কালিদাস কূটজকে বলেছেন বর্ষার ফুল। তার মেঘদূত কাব্যের ‘পূর্বমেঘ’ খণ্ডে দুটি জায়গায় কুরচি ফুলের উল্লেখ রয়েছে। কবি কালিদাস লিখেছেন, ‘ত্বরা করি সখা চলে যাও আমার প্রিয়ার কারণে/তবু সময় যাবে গিরিতে গিরিতে কূটজ ফুলের টানে।’
সুদর্শন পত্রঝরা স্বভাবের বহুবর্ষজীবী দ্রুত বর্ধনশীল ছোট গাছটি ছয় মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। সরল কাণ্ডবিশিষ্ট গাছ। বাকল হালকা ধূসর ও অমসৃণ। শীতের শেষে গাছের পাতা ঝরে যায় ও বসন্তে নতুন পাতা গজায়। পাতার বোঁটা খুব খাটো, ডালে বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে, ডিম্বাকার ও অগ্রভাগ সুচালো। কিনারা মসৃণ বা খাঁজবিহীন ও সবুজ। গাছের ডাল ও পাতা ছিঁড়লে সাদা দুধের মতো আঠালো কষ ঝরে।
কয়েকটা থোকায় সাদা রঙের সুগন্ধি ফুল ফোটে এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে। ছোট গাছেও প্রচুর ফুল ফোটে। কয়েক দফায় ফোটে। ফুলের পাপড়ি পাঁচটি। নিচের অংশ নলাকৃতির এবং মুক্ত অংশটি খানিকটা বাঁকানো থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলগুলোর রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হলদে হয়ে যায়। একটি ফুল থেকে দুটি ফল জন্মে। ফল লম্বা, সরু, বাদামি ও বহুবীজবিশিষ্ট।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক



