বারমুডার চেয়েও ভয়ংকর? আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলের অমীমাংসিত রহস্য

আসলেই কি আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি কাজ করে?
একজন অভিজ্ঞ উদ্ধারকর্মী বেরিয়েছিলেন একজন নিখোঁজ মানুষকে খুঁজতে। আলাস্কার দুর্গম পাহাড়ে এমন অভিযান তাঁর কাছে নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু সেই মানুষটিকেই আর খুঁজে পাওয়া গেল না। এক বছর পর মিলল শুধু তার গাড়ি। ইঞ্জিন বন্ধ। চারপাশে বরফ আর মৃত্যু নীরবতা। মানুষটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন। আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলের গল্প শুরু করা যায় এভাবেই।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নাম প্রায় সবাই শুনেছেন। কিন্তু উত্তর আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে, বরফে মোড়া বিশাল এক অঞ্চলেও রয়েছে আরেকটি ‘ত্রিভুজ’, যাকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। এর নাম আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল। সাধারণত আলাস্কার জুনাও, অ্যাংকোরেজ এবং উত্তর উপকূলের শহর উটকিয়াগভিককে (সাবেক ব্যারো) যুক্ত করলে যে বিশাল ত্রিভুজাকার অঞ্চল তৈরি হয়, সেটিকেই বলা হয় আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল।
আয়তনে এটি অনেক দেশের চেয়েও বড়। এর ভেতরে আছে হিমবাহ, তুষারাবৃত পর্বত, ঘন বন, জলাভূমি, তুন্দ্রা এবং শত শত মাইলজুড়ে এমন এলাকা যেখানে মানুষের পা প্রায় পড়ে না। রহস্যের শুরু এখানেই। আলাস্কায় নিখোঁজ মানুষের হার যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো অঙ্গরাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি। রাজ্যটির জনসংখ্যা কম হলেও প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে নিখোঁজের সংখ্যা জাতীয় গড়ের কয়েক গুণ। এ কারণেই বহু বছর ধরে আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, টেলিভিশন তথ্যচিত্র এবং রহস্যপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
তবে এই রহস্যকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল ১৯৭২ সালের একটি ঘটনা। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর একটি ছোট উড়োজাহাজ অ্যাংকোরেজ থেকে জুনাওর উদ্দেশে উড়ে। যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হেল বগস এবং আলাস্কার কংগ্রেসম্যান নিক বেগিচ। মাঝপথে উড়োজাহাজটি অদৃশ্য হয়ে যায়। শুরু হয় মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুসন্ধান অভিযান। বিমান, হেলিকপ্টার, কোস্ট গার্ড, সামরিক বাহিনী সবাই নামে খোঁজে। কিন্তু পাওয়া যায়নি এমনকি উড়োজাহাজটির কোনো ধ্বংসাবশেষও। এ ঘটনা আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। এরপর একের পর এক অন্তর্ধানের ঘটনা সেই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
২০১৯ সালে ফেয়ারব্যাংকসে নিখোঁজ হন ৪৩ বছর বয়সী শ্যানান ওমান। তিনি নিজের কাপড়চোপড়, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এমনকি প্রিয় কুকুরটিকেও ফেলে গিয়েছিলেন। ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। এরও আগে ২০১১ সালে জেরাল্ড ডিবেরি নামে এক অভিজ্ঞ উদ্ধারকর্মী এক নিখোঁজ নারীকে খুঁজতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে যান। তাঁর অল-টেরেইন যান পরে উদ্ধার হলেও মানুষটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এমন গল্প আলাস্কায় কম নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসলেই কি এখানে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি কাজ করে? রহস্যপ্রেমীদের একটি অংশের উত্তর, হ্যা। তাদের মতে, আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলে অস্বাভাবিক তড়িৎ-চুম্বকীয় কার্যকলাপ থাকতে পারে। কেউ কেউ দাবি করেন, এখানকার কিছু এলাকায় কম্পাস অস্বাভাবিক আচরণ করে। আবার বহু মানুষ আকাশে অদ্ভুত আলো কিংবা ত্রিভুজাকার উড়ন্ত বস্তু দেখার কথাও বলেছেন। এসব কারণেই ইউএফওপ্রেমীদের কাছে জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়।
বিভিন্ন তথ্যচিত্র ও সংবাদ প্রতিবেদনের দাবি, ১৯৭০-এর দশক থেকে এই অঞ্চলের সঙ্গে ২০ হাজারের বেশি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জড়িত। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে গবেষক ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি প্রাচীন কিংবদন্তি। আলাস্কার ট্লিঙ্গিট আদিবাসীদের লোককথায় আছে ‘কুশটাকা’ নামের এক রহস্যময় প্রাণীর গল্প। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক ভোঁদড়সদৃশ এই সত্তা নাকি মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করতে পারে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, পথ হারানো মানুষকে ডেকে নিয়ে যায় সে। অনেক সময় বিপদে পড়া স্বজনের কণ্ঠস্বর শুনে কেউ সাহায্য করতে এগোলে আর ফিরে আসে না। অবশ্য এর পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে আলাস্কার বিস্তীর্ণ বন্যপ্রকৃতিতে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের গল্পে কুশটাকার নাম আজও ঘুরে ফিরে আসে।
রহস্য এখানেই শেষ নয়। আলাস্কার দক্ষিণে কেনাই উপদ্বীপে রয়েছে একটি পরিত্যক্ত বসতি, পোর্টলক। বহু বছর ধরে গল্প চালু আছে যে ‘নানতিনাক’ নামে বিগফুট-সদৃশ এক প্রাণীর ভয়ে বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। স্থানীয় লোককথায় প্রাণীটিকে মানুষ অপহরণকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এই গল্পে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, পোর্টলক আসলে অর্থনৈতিক কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল। নতুন সড়ক নির্মাণের পর সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব কমে যায়, ফলে ধীরে ধীরে লোকজন অন্যত্র চলে যায়। বিগফুটের গল্পগুলো অনেক পরে জনপ্রিয় হয় এবং এর কিছু অংশ অতিরঞ্জিত কিংবা মনগড়া হওয়ার অভিযোগও আছে। এটাই আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলের সবচেয়ে মজার দিক। এখানে প্রতিটি রহস্যের অন্তত দুটি গল্প আছে। একটি লোককথার, আরেকটি বাস্তবতার।
বিজ্ঞানীরা রহস্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু বাস্তব কারণের কথা বলেন। প্রথমত, আলাস্কার ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত প্রতিকূল। এখানে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা এমন আছে যেখানে মোবাইল ফোনের সিগন্যাল নেই, রাস্তা নেই, এমনকি উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতেও দিন লেগে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আবহাওয়া মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। পরিষ্কার আকাশ কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘন কুয়াশা, তুষারঝড় বা প্রবল বাতাসে ঢেকে যেতে পারে। তৃতীয়ত, আলাস্কায় ছোট উড়োজাহাজের ব্যবহার খুব বেশি। দুর্গম অঞ্চলে এগুলোই প্রধান যোগাযোগমাধ্যম। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি।
আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য নিয়ে বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র ও টেলিভিশন সিরিজ নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো দ্য আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল। ২০২০ সালে হিস্ট্রি চ্যানেলে প্রচার শুরু হওয়া এই সিরিজে আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলের নিখোঁজ মানুষ, অদ্ভুত আলো, ইউএফও, বিগফুট, রহস্যময় প্রাণী এবং অনাবিষ্কৃত ভূগর্ভস্থ কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও কিংবদন্তি অনুসন্ধান করা হয়েছে। এ ছাড়া মিসিং ইন আলাস্কা সিরিজে ১৯৭২ সালে কংগ্রেসম্যান হেল বগস ও নিক বেগিচকে বহনকারী বিমানের অন্তর্ধান নিয়ে অনুসন্ধান দেখানো হয়। যদিও এসব অনুষ্ঠানে রহস্যময় ব্যাখ্যাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অনেক গবেষক মনে করেন এগুলো মূলত বিনোদনধর্মী তথ্যচিত্র; তাই সেখানে উত্থাপিত দাবিগুলোকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে নয়, বরং অনুসন্ধানযোগ্য তত্ত্ব ও লোককথা হিসেবে দেখা ভালো।
২০২৫ সালেও আলাস্কায় একটি যাত্রীবাহী ছোট বিমান নিখোঁজ হওয়ার পর তার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং সবাই নিহত হন। আর সব ব্যাখ্যার পরেও কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়। কেন এত মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায় না? কেন কিছু দুর্ঘটনার কোনো ধ্বংসাবশেষ মেলে না? কেন এত প্রত্যক্ষদর্শী অদ্ভুত আলো বা অজানা প্রাণীর গল্প বলেন? হয়তো উত্তর লুকিয়ে আছে আলাস্কার বিস্তীর্ণ বন্য প্রকৃতির মধ্যেই। পৃথিবীর এমন কিছু জায়গা আছে যেগুলো সম্পর্কে মানুষের অনেক কিছুই জানা বাকি। আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল সেই জায়গাগুলোর একটি।
সূত্র: আলাস্কা ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক সেফটি, ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি), হিস্ট্রি চ্যানেল, ডিসকভারি চ্যানেল, ব্রিটানিকা, ইউএস কোস্ট গার্ড, দ্য গার্ডিয়ান, আলাস্কা ম্যাগাজিন, ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাংকস, ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)






