যে ‘তাপ-গম্বুজ’ পুড়িয়ে দিচ্ছে শহর থেকে শহর

হিট ডোমের আগুনে পুড়ছে প্রকৃতি। ছবিটি এআই ব্যবহার করে তৈরি
গরম পড়েছে। কিন্তু এবারের গরম আগের মতো নয়। রোদ উঠলেই গরম, আবার সন্ধ্যায় একটু ঠান্ডা, সেই চেনা ছবি এখন আর নেই। এখন গরম নামে, আর যায় না। দিনের পর দিন একই দমবন্ধ অবস্থা। বিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির একটা নাম দিয়েছেন, হিট ডোম বা তাপ-গম্বুজ। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ব্যাপারটা আসলে বেশ সহজ। আর এই ঘটনাই এখন বিশ্বজুড়ে গ্রীষ্মকালকে বদলে দিচ্ছে। আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
আকাশে যেন একটা ঢাকনা বসে গেছে
ধরুন, একটা বড় হাঁড়িতে ভাত রান্না হচ্ছে। ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করা আছে। ভেতরের বাষ্প বের হতে পারছে না, তাপ বাড়তেই থাকছে। হিট ডোমও অনেকটা এভাবেই কাজ করে। যখন বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে কোনো একটা জায়গায় বিশাল উচ্চচাপের বলয় তৈরি হয়, তখন সেটা ওই এলাকার ওপর একটা অদৃশ্য ঢাকনার মতো জেঁকে বসে। নিচের গরম বাতাস উপরে উঠতে চায়, কিন্তু উচ্চচাপের দেয়াল তাকে ঠেলে নিচে নামিয়ে দেয়। নামতে নামতে সেই বাতাস আরও গরম হয়ে যায়। মেঘ তৈরি হতে পারে না, বৃষ্টি নেই, রোদ আসতেই থাকে — আর তাপ জমতেই থাকে। এভাবে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহ ধরে একটানা গরম চলতে পারে।
কেন তৈরি হয় এই গম্বুজ?
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উপরের দিকে একটা শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ আছে — বিজ্ঞানীরা এটাকে বলেন জেট স্ট্রিম। এটা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বয়ে যায়, অনেকটা নদীর স্রোতের মতো। এই জেট স্ট্রিমই আবহাওয়াকে একটা জায়গা থেকে সরিয়ে নতুন আবহাওয়া আনে।
কিন্তু যখন জেট স্ট্রিমের গতি কমে যায় বা এর বাঁক অনেক বড় হয়ে পড়ে, তখন সেটা একটা জায়গায় আটকে যায়। আর সেই আটকে যাওয়া প্রবাহ উচ্চচাপের বলয়কে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখে। তৈরি হয় হিট ডোম। সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াও এতে বড় ভূমিকা রাখে। সমুদ্র গরম হলে বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ধারা বদলে যায়, আর হিট ডোম তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।
ইউরোপের দিকে তাকালে বোঝা যায় কতটা ভয়ানক
এই জুন মাসে ইউরোপের দিকে তাকালে হিট ডোমের শক্তি টের পাওয়া যায়। ফ্রান্সে জাতীয়ভাবে গড় তাপমাত্রা উঠেছে ৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে, একটি শহরে ছুঁয়েছে ১১১ ডিগ্রি। ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, চেক রিপাবলিক — সব জায়গায় শতবর্ষের রেকর্ড ভেঙে পড়েছে। কিন্তু গরম শুধু শরীরে লাগেনি, পুরো অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে।
রাস্তার পিচ গলে গেছে, রেললাইনের ধাতব পাত প্রচণ্ড তাপে বেঁকে গিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছে, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে লক্ষাধিক মানুষ অন্ধকারে বসে আছেন। স্কুল বন্ধ, হাসপাতালে চাপ বেড়েছে পঞ্চাশ শতাংশ। এই ক্ষয়ক্ষতিই বলে দেয় — হিট ডোম কতটা শক্তিশালী এবং কতটা অপ্রস্তুত আমরা এর সামনে।
হিট ডোম কি নড়ে?
হ্যাঁ, তবে খুব ধীরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই তাপ-গম্বুজ একটা জায়গায় থমকে থাকে। কোনো কোনো সময় এটা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে নতুন এলাকা ঢেকে ফেলে। যতক্ষণ না উচ্চচাপের ওই বলয় ভেঙে পড়ছে, ততক্ষণ স্বস্তি নেই। জেট স্ট্রিম যখন আবার সক্রিয় হয়ে বলয়টাকে ভেঙে দেয়, তখনই গরম কমে। কিন্তু সেটা কখন হবে — সেটা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না।
জলবায়ু পরিবর্তন গরমটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে
শুধু হিট ডোম নয়, জলবায়ু পরিবর্তন এই পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তুলছে। আগে পৃথিবীর তাপমাত্রা কম ছিল। হিট ডোম তৈরি হলেও তাপমাত্রা একটা সহনীয় পর্যায়ে থাকত। এখন পৃথিবী আগে থেকেই গরম — সমুদ্র গরম, মাটি গরম। তার ওপর হিট ডোম পড়লে তাপমাত্রা মানুষের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়। আরেকটা সমস্যা হলো মাটির আর্দ্রতা। গরম ও খরায় মাটি শুকিয়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় মাটি থেকে পানি বাষ্প হয়ে ওঠে, যা কিছুটা শীতল পরিবেশ তৈরি করে।
কিন্তু শুকনো মাটিতে সেটা হয় না। ফলে গরম আরও বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের ঘটনা আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন হচ্ছে এবং প্রতিটি ঘটনা আগেরটার চেয়ে বেশি তীব্র। গরম ও আর্দ্রতা — শরীরের জন্য বিপদ শুধু বেশি গরম হলেই বিপদ নয়। সঙ্গে যদি বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে আমাদের শরীর গরমে ঘাম ঝরিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। ঘাম বাষ্প হয়ে উড়ে যায় — আর শরীর ঠান্ডা হয়। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হলে ঘাম বাষ্প হতে পারে না। শরীর ঠান্ডা হওয়ার সুযোগই পায় না। এই অবস্থা দীর্ঘক্ষণ চললে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে, প্রচণ্ড দুর্বলতা আসে, এমনকি হিট স্ট্রোক হতে পারে। হিট স্ট্রোক হলো শরীরের তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়া — চিকিৎসা না পেলে মানুষ মারাও যেতে পারে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, দীর্ঘদিনের অসুখে আক্রান্ত রোগী এবং যাঁরা রোদে কাজ করেন — এঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
হিট ডোমের মধ্যে টিকে থাকতে কিছু সহজ কিন্তু জরুরি নিয়ম মানতে হবে। প্রচুর পানি পান করুন — তেষ্টা না পেলেও। রোদের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এই সময়ে বাইরে যতটা সম্ভব কম থাকুন। ঘরে ফ্যান চালু রাখুন। ঠান্ডা পানিতে গোসল করুন বা হাত-পা ভিজিয়ে রাখুন। ভেজা কাপড় ঘাড়ে ও কপালে রাখলে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়। যদি ঘরে এসি না থাকে, কাছের কোনো শপিং মল, লাইব্রেরি বা কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে কিছুক্ষণ থাকুন। এই গরমে প্রতিবেশী, বিশেষত বয়স্ক বা একা থাকা মানুষদের খোঁজ রাখুন। হিট স্ট্রোকের লক্ষণ — মাথা ঘোরা, বমি ভাব, শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া — এগুলো দেখা দিলে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যান।
হিট ডোম নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটা এখন আগের চেয়ে বেশি ঘন ঘন আসছে, বেশি দিন থাকছে এবং বেশি ক্ষতি করছে। চেনা গ্রীষ্মকাল আর নেই — এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই এখন সাবধান থাকতে হবে।
সূত্রঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক







