বুদ্ধ পূর্ণিমা সম্পর্কে এই ১০ তথ্য জানেন কি?

বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধপূর্ণিমা পালন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
বুদ্ধপূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই দিবস পালন করা হয় বলে এটি ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত।
আজ ১ মে শুক্রবার বুদ্ধ পূর্ণিমা। খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দের এই দিনে লুম্বিনীতে গৌতম বুদ্ধ জন্ম নেন। ৫৮৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের এই দিনে তিনি সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে জগতে ‘বুদ্ধ’ নামে খ্যাত হন। আর ৫৪৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে একই দিনে তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।
বুদ্ধের জীবনের এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একই তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল বলে দিনটি ‘ত্রিস্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধপূর্ণিমা’ নামে পরিচিত বিশ্বজুড়ে। সিদ্ধার্থের বুদ্ধত্ব লাভের মধ্য দিয়েই জগতে শান্তি ও মুক্তির ধর্ম ‘বৌদ্ধধর্ম’ প্রবর্তিত হয়।
এই পুণ্যতিথিতে বৌদ্ধরা বুদ্ধ পূজা-সহ পঞ্চশীল, অষ্টশীল পালন, সূত্র পাঠ, সমবেত প্রার্থনা এবং নানা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বিভিন্ন পূজা ও আচারের পাশাপাশি দিনটিতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
এ্ই বিশেষ দিনে জেনে নিন আধুনিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধ পূর্ণিমা সম্পর্কে দেশি-বিদেশি ১০ তথ্য
শ্রীলঙ্কার ‘ভেসাক পোয়া’: বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশ শ্রীলঙ্কা। দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হলো বুদ্ধপূর্ণিমা। শ্রীলঙ্কার ভাষায় যার নাম ‘ভেসাক পোয়া’। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো লঙ্কানদের মধ্যে দুই দিন ধরে চলে দু আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক আনন্দমিলনমেলা, যার প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয় ডিসেম্বর থেকে।
শান্তির প্রতীক শ্বেত কপোত মুক্তি: বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে অনেক দেশে খাঁচার বন্দী পাখি বা প্রাণী অবমুক্ত করার প্রথা রয়েছে। এটি মূলত বুদ্ধের অহিংসা এবং সব জীবের প্রতি করুণার বার্তার প্রতীক। শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই প্রথাটি বেশ জনপ্রিয়।
পঞ্চশীল ও অষ্টাঙ্গিক মার্গ পালন: এই দিনে গৃহীরা বুদ্ধের দেখানো পাঁচটি নৈতিক শিক্ষা বা ‘পঞ্চশীল’ (অহিংসা, সত্যবাদিতা, চৌর্যবৃত্তি না করা, যৌন অনাচার ও নেশাদ্রব্য বর্জন) পালনের বিশেষ সংকল্প গ্রহণ করেন। অনেকে এ সময় দুপুরের পর আর আহার গ্রহণ না করে সংযম পালন করেন।
ফানুস ও থং লো উৎসব: থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে বুদ্ধ পূর্ণিমার রাতে হাজার হাজার রঙিন ফানুস আকাশে ওড়ানো হয়। তাদের বিশ্বাস, ফানুস ওড়ানোর মাধ্যমে জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভাগ্য দূরে সরে যায়।
বোধিবৃক্ষের পূজা: ভারতের বুদ্ধগয়ায় অবস্থিত যে অশ্বত্থ গাছের নিচে বুদ্ধ ধ্যান করে জ্ঞান লাভ করেছিলেন, তাকে বলা হয় ‘বোধিবৃক্ষ’। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন ভক্তরা এই গাছের গোড়ায় সুগন্ধি জল ও দুধ ঢেলে পূজা করেন এবং গাছের ডালগুলো রঙিন পতাকা দিয়ে সাজান।
সুজাতার ক্ষীর ও ভোজন উৎসব: কথিত আছে, দীর্ঘ কঠোর তপস্যার পর সুজাতা নামের এক নারী বুদ্ধকে দুধ-চালের পায়েস বা ক্ষীর খাইয়েছিলেন। সেই স্মরণে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন অনেক জায়গায় ভক্তদের মাঝে ক্ষীর বা পায়েস বিতরণ করা হয়। বাংলাদেশেও বিহারগুলোতে বিশেষ পায়েস রান্নার আয়োজন থাকে।
লাওসের ‘রকেট উৎসব’: লাওসে বুদ্ধ পূর্ণিমার সময় ‘বুন বাং ফাই’ বা রকেট উৎসব পালন করা হয়। তারা বিশ্বাস করে, আকাশে রকেট ছুড়লে বৃষ্টি নামবে এবং ফসল ভালো হবে। এটি বুদ্ধের প্রতি ভক্তির পাশাপাশি কৃষি ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
পঞ্চবর্ণের বৌদ্ধ পতাকা: বৌদ্ধ বিহারগুলোতে এই দিনে যে রঙিন পতাকা দেখা যায়, তার পাঁচটি রঙ বুদ্ধের দেহ থেকে নির্গত হওয়া জ্যোতির প্রতীক বলে ধরা হয়। রঙগুলো হলো—নীল (শান্তি), হলুদ (মধ্যপন্থা), লাল (প্রজ্ঞা), সাদা (শুদ্ধি) এবং কমলা (ভক্তি)।
‘বোরোবুদুর' বিহারের মহা সম্মেলন: ইন্দোনেশিয়ার জাভাতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বড় বৌদ্ধ মন্দির ‘বোরোবুদুরে’ হাজার হাজার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সমবেত হয়ে প্রার্থনা করেন। সেখানে চন্দ্রোদয়ের মুহূর্তে বৌদ্ধ গান ও মন্ত্রপাঠে এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি হয়।
জাপানের ‘হানা মাতসুরি’: জাপানে বুদ্ধের জন্মদিন পালিত হয় ৮ই এপ্রিল, যা ‘হানা মাতসুরি’ বা ফুল উৎসব নামে পরিচিত। সেখানে ভক্তরা বুদ্ধের শিশু প্রতিমূর্তিতে ‘আমা-চা’ (এক ধরণের মিষ্টি চা) ঢালেন। এটি মূলত বুদ্ধের জন্মের সময় দেবদূতদের আকাশ থেকে সুগন্ধি জল বর্ষণের ঘটনার প্রতীক।
বুদ্ধ পূর্ণিমা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানুষের মনে শান্তি, মৈত্রী এবং অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম। বুদ্ধের সেই অমোঘ বাণী— ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ (সব্বে সত্তা ভবন্তু সুখিতত্তা), আজও বর্তমান পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা।







