রবিন হুড নায়ক ছিলেন নাকি খলনায়ক

ইতিহাসবিদদের মতে, রবিন হুড সম্ভবত কোনো একক বাস্তব ব্যক্তি ছিলেন না
সবুজ পোশাক, মাথায় পালক লাগানো টুপি, ধনীদের কাছ থেকে লুট করে দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া এক ন্যায়পরায়ণ বীর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রবিন হুডকে আমরা এভাবেই জেনে এসেছি। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের ডিজনির অ্যানিমেশন ছবির পর এই চেহারাটাই মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসবিদরা বলছেন, আসল রবিন হুড হয়তো একেবারেই এমন ছিলেন না।
নতুন চলচ্চিত্র দ্য ডেথ অব রবিন হুড সেই পুরোনো ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করছে। পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার মাইকেল সার্নোস্কির ছবিতে হিউ জ্যাকম্যান অভিনয় করেছেন এক বৃদ্ধ, যুদ্ধক্লান্ত রবিনহুডের চরিত্রে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের কিংবদন্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন।
এক পর্যায়ে একজন নারী তাকে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করা মহান রবিন হুডের কথা বললে তিনি বলেন, ‘সে কোনো নায়ক ছিল না। লুটপাট আর খুন করত, কারণ এগুলো উপভোগ করত লোকটা।’
শুনতে অবাক লাগলেও ইতিহাসের প্রথম দিকের রবিন হুড কাহিনিগুলোর সঙ্গে এই চিত্রটাই বেশি মিলে যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, রবিন হুড সম্ভবত কোনো একক বাস্তব ব্যক্তি ছিলেন না। বরং মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে ধনী জমিদার আর দরিদ্র কৃষকদের বৈষম্যময় সমাজ থেকে তার জন্ম। দ্বাদশ শতকে রবিনহুডের গল্প মুখে মুখে ছড়াতে শুরু করে। তবে প্রথম লিখিত রূপ পাওয়া যায় প্রায় দুই শতক পরে।
সেই প্রাচীন ব্যালাডগুলোতে রবিন হুড কোনো অভিজাত ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ইওম্যান অর্থাৎ সাধারণ কৃষকের চেয়ে কিছুটা উচ্চ সামাজিক অবস্থানের মানুষ। সেখানে মেরিয়ান নামে কোনো চরিত্রও ছিল না; তিনি গল্পে যোগ দেন ষোল শতকে।
আর সবচেয়ে বড় বিষয়, গরিবদের সাহায্য করাই তার মূল কাজ ছিল না। রবিন হুডের প্রধান শত্রু ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ধর্মযাজক এবং ক্ষমতাবান জমিদার শ্রেণি, যারা সাধারণ মানুষকে শোষণ করত।
মধ্যযুগ নিয়ে গবেষণা করা লেখক অ্যামি এস কফম্যান তার নতুন উপন্যাস দ্য ট্রেইটর অব শেরউড ফরেস্ট-এ লিখেছেন, প্রাচীন কাহিনির রবিন হুড ছিলেন ‘নৈতিকভাবে ধূসর এক ধূর্ত বিদ্রোহী’—একজন সহিংস, বেপরোয়া এবং নিয়মভাঙা চরিত্র।
কফম্যান আরও উল্লেখ করেন, ‘প্রতিটি ব্যালাডেই হয় তার করুণ পরিণতি ঘটে, অথবা সে নিজের ভুলের শিকার হয়।’
ষোল শতকে এসে গল্পে বড় পরিবর্তন ঘটে। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি নিজেও রবিন হুডের ভক্ত ছিলেন এবং কখনো কখনো তার সাজও পরতেন। ধীরে ধীরে উচ্চবিত্ত সমাজ রবিনহুডকে নিজেদের মতো করে বদলে নেয়। যে মানুষটি আগে অভিজাতদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন, তাকেই অভিজাত বানিয়ে ফেলা হয়। তিনি আর সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্ন করেন না; বরং ভালো রাজা রিচার্ডকে সিংহাসনে ফিরিয়ে আনার নায়ক হয়ে ওঠেন। দুষ্ট প্রিন্স জন-এর বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের গল্পও তখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
উনিশ শতকে শিশুদের বই রবিন হুডকে আরও ভদ্র, পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক চরিত্রে রূপ দেয়। পরে সিনেমা সেই চিত্রকেই প্রতিষ্ঠিত করে। এরল ফ্লিন, কেভিন কস্টনার, রাসেল ক্রো প্রায় সবাই সেই পরিচিত বীর রবিন হুডের ভূমিকাতেই অভিনয় করেছেন।
তবে কিছু ব্যতিক্রমও আছে। ১৯৭৬ সালের রবিন অ্যান্ড মেরিয়ান ছবিতে শন কনারি অভিনয় করেছিলেন এক বৃদ্ধ রবিন হুডের চরিত্রে, যিনি জীবনের শেষ দিকে এসে নিজের অতীত ও অসংখ্য মৃত্যুর অর্থ খুঁজছিলেন।
নতুন প্রজন্মের এই অন্ধকার রবিন হুড আসলে মধ্যযুগের গল্পগুলোর কাছাকাছি। একই সঙ্গে তারা বর্তমান সময়েরও প্রতিচ্ছবি। কারণ আজকের পৃথিবীতেও মানুষ খুব দ্রুত কাউকে নায়ক, কাউকে খলনায়ক বানিয়ে ফেলে। অথচ বাস্তব জীবন সাধারণত সাদা-কালো নয়; বরং ধূসর।
সার্নোস্কির মতে, রবিনহুড নিজের গল্পকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। কিংবদন্তি তৈরি করে তিনি অনুসারী জোগাড় করতেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই বিষয়গুলো আরও প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা প্রতিদিন গল্প, মতাদর্শ আর প্রচারণার ভেতর দিয়ে নায়ক ও খলনায়ক তৈরি করছি। তবু হয়তো মানুষের মনে ডিজনির রবিন হুডই বেঁচে থাকবে। তিনি এখন কেবল একটি কিংবদন্তি চরিত্র নন; ন্যায়বিচার, বিদ্রোহ আর স্বপ্নের প্রতীক।
সূত্র: বিবিসি






