মানুষ নয়, ঘোড়াকে রাষ্ট্রীয় পদে বসাতে চেয়েছিলেন সম্রাট!

বিশেষ ভোজে ক্যালিগুলা ও তার ঘোড়া
রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এমন এক সম্রাটের কথা পাওয়া যায়, যিনি নিজের প্রিয় ঘোড়াকে রাজকীয় মর্যাদায় রেখেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ঘোড়াটিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদগুলোর একটিতে বসানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন বলে কথিত আছে। সম্রাটের নাম ক্যালিগুলা, আর ঘোড়াটির নাম ইনসিটাটাস। প্রায় দুই হাজার বছর আগের এই ঘটনা আজও ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও কৌতূহলোদ্দীপক গল্প।
প্রিয় ঘোড়ার জন্য রাজকীয় আয়োজন
ক্যালিগুলা ৩৭ থেকে ৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেন। তাঁর আসল নাম ছিল গাইয়ুস জুলিয়াস সিজার অগাস্টাস জার্মানিকাস। শৈশবে সেনাবাহিনীর পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে ছোট জুতা পরতেন। সেই জুতা থেকেই তাঁর নাম হয় ক্যালিগুলা, যার অর্থ ছোট জুতা।
সম্রাটের প্রিয় ঘোড়া ইনসিটাটাসের জীবনযাপন ছিল সাধারণ কোনো প্রাণীর মতো নয়। প্রাচীন রোমান লেখক সুয়েটোনিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, ঘোড়াটির জন্য তৈরি করা হয়েছিল মার্বেলের আস্তাবল। ছিল হাতির দাঁতের খাবারের পাত্র, বেগুনি রঙের দামি কম্বল এবং মূল্যবান পাথরখচিত গলার হার। এমনকি তার জন্য আলাদা বাড়ি, আসবাবপত্র ও একদল দাসও নিয়োগ করা হয়েছিল।
ঘোড়াটির বিশ্রাম যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতার আগের দিন আশপাশের এলাকায় নীরবতা বজায় রাখতে সৈন্য পাঠাতেন সম্রাট। ইনসিটাটাসের নামে অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও করা হতো।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘোড়া!
ইনসিটাটাসকে ঘিরে সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটি হলো, ক্যালিগুলা তাকে কনসাল পদে বসাতে চেয়েছিলেন। প্রাচীন রোমে কনসাল ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদ। সাধারণত দুজন কনসাল নির্বাচিত হতেন। তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সামরিক নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন।
সুয়েটোনিয়াস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য লাইভস অব দ্য টুয়েলভ সিজারস’-এ লিখেছেন, ক্যালিগুলা ইনসিটাটাসকে কনসাল করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে শোনা যায়। পরবর্তী সময়ে রোমান ইতিহাসবিদ ক্যাসিয়াস ডিওর লেখাতেও এই ঘটনা উঠে এসেছে। তবে ঘোড়াটিকে সত্যিই ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অপমান, ব্যঙ্গ নাকি সম্রাটের খেয়াল?
আধুনিক ইতিহাসবিদদের কাছে ঘটনাটি এখনো আলোচনার বিষয়। কেউ কেউ মনে করেন, ক্যালিগুলা হয়তো রোমান সিনেটরদের অপমান করতে এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে সিনেটরদের গুরুত্ব একটি ঘোড়ার চেয়েও বেশি নয়—এমন বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। আবার এটি সম্রাটের ক্ষমতা প্রদর্শন কিংবা রাজনৈতিক ব্যঙ্গও হতে পারে।
২০১৪ সালে ‘দ্য ক্ল্যাসিক্যাল কোয়ার্টারলি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ ডেভিড উডসের গবেষণায় বলা হয়, সুয়েটোনিয়াস ও ক্যাসিয়াস ডিও দুজনেই ঘোড়াটিকে কনসাল করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ক্যালিগুলা ঠিক কী বলেছিলেন বা করেছিলেন, যার ভিত্তিতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা তাঁরা ব্যাখ্যা করেননি।
৪১ খ্রিষ্টাব্দে এক ষড়যন্ত্রে নিহত হন ক্যালিগুলা। ইনসিটাটাসের পরবর্তী জীবন সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে একটি ঘোড়াকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর পরিকল্পনার এই গল্প আজও রোমান ইতিহাসের বিচিত্র অধ্যায় হয়ে আছে।
সূত্র: সুয়েটোনিয়াস- দ্য লাইভস অব দ্য টুয়েলভ সিজারস; ক্যাসিয়াস ডিও- রোমান হিস্ট্রি; ডেভিড উডস- দ্য ক্ল্যাসিক্যাল কোয়ার্টারলি (২০১৪); ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড- মিথবাস্টিং অ্যানশিয়েন্ট রোম; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস



