মেরে ফেললেও মরে না!
অমরত্বের রহস্য লুকিয়ে এক ক্ষুদ্র জেলিফিশের শরীরে
- বারবার ‘শিশু’ হয়ে নতুন জীবন বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ে টুরিটোপসিস

সংগৃহীত ছবি
মৃত্যুকেও যেন হার মানায় এই জেলিফিশ! বারবার ‘শিশু’ হয়ে নতুন জীবন বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ে টুরিটোপসিস।
মানুষ যুগের পর যুগ ধরে অমরত্বের স্বপ্ন দেখে এসেছে। পুরাণ, সাহিত্য থেকে আধুনিক বিজ্ঞান সব জায়গাতেই মৃত্যুকে জয় করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু পৃথিবীর বুকেই এমন এক প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে, যা বার্ধক্য বা প্রতিকূল অবস্থার মুখে নিজের জীবনচক্রকে উল্টে দিয়ে একেবারে শৈশবে ফিরে যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের কাছে সেই বিস্ময়কর প্রাণীর নাম টুরিটোপসিস ডোর্নি (Turritopsis dohrnii)। যা ‘অমর জেলিফিশ’ নামেই বেশি পরিচিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক মারিয়া পিয়া মিগলিয়েত্তার কথায়, প্রতিকূল পরিবেশে এই জেলিফিশের আচরণ অন্য সব প্রাণী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়। পানির অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খাদ্যের অভাব, রাসায়নিক দূষণ, এমনকি শরীর কেটে গেলেও সাধারণ জেলিফিশের মতো মৃত্যু নয়। বরং আবারও শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়।
সাধারণ জেলিফিশের জীবনচক্রে প্রথমে লার্ভা, পরে পলিপ, সেখান থেকে পূর্ণবয়স্ক মেডুসা। আর প্রজননের পর ধীরে ধীরে মৃত্যু হয়। কিন্তু টুরিটোপসিস ডোর্নি সেই স্বাভাবিক নিয়ম মানে না, কারণ বিপদ দেখা দিলেই পূর্ণবয়স্ক অবস্থা থেকে আবারও পলিপ পর্যায়ে ফিরে যায়। তারপর নতুন করে বেড়ে ওঠে, যেন সদ্য আবার জন্ম নিল।
আর বিজ্ঞানীরা এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন ‘সেলুলার ট্রান্সডিফারেন্সিয়েশন’। এতে শরীরের একটি কোষ অন্য ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে পারে। এরপর জেলিফিশটি প্রথমে ছোট একটি গোলকের মতো হয়ে যায় এবং মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেই অবস্থা থেকে নতুন পলিপ তৈরি হয়। জিনগত বৈশিষ্ট্যও থাকে একইরকম।
গবেষণাগারে এই জেলিফিশকে অনির্দিষ্টকাল বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তবে প্রকৃতিতে শিকারি প্রাণীর আক্রমণে তাদের মৃত্যু হতে পারে। অর্থাৎ বার্ধক্যে নয়, বাইরের কারণে জীবন শেষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশ্ব জুড়ে টুরিটোপসিস এর আটটি স্বীকৃত প্রজাতি রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত শুধু টুরিটোপসিস ডোর্নিই বারবার জীবনচক্রে ফিরে যাওয়ার এই অসাধারণ ক্ষমতার জন্য পরিচিত। আকারে মাত্র কয়েক মিলিমিটার হলেও ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর, জাপানের উপকূল, পানামা ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন সামুদ্রিক অঞ্চলে এই ক্ষুদ্র জেলিফিশটির দেখা মেলে। জেলিফিশ বিশেষজ্ঞ জীববিজ্ঞানী ড. লিসা অ্যান গার্শউইনের মতে, মানুষের অমরত্বের স্বপ্ন বহু প্রাচীন। অথচ সেই ক্ষমতার সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে এক ক্ষুদ্র জেলিফিশের মধ্যে। এই প্রাণীর পুনর্জন্মের ক্ষমতাই তাকে প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময় করে তুলেছে। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী তাই শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়ই নয়। বার্ধক্য, কোষের পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে ভাবাচ্ছে বিশ্বকে।
ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন






