কয়েক ফোঁটা পানিতেই প্রাণ ফেরে যে ‘মৃত’ উদ্ভিদের

সংগৃহীত ছবি
প্রকৃতিতে কত রকমের বিস্ময়ই না লুকিয়ে আছে! কিন্তু এমন কোনো উদ্ভিদের কথা কি শুনেছেন, যা বছরের পর বছর মৃত বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে পড়ে থাকার পরও মাত্র কয়েক ফোঁটা পানি পেলেই আবার জ্যান্ত হয়ে ওঠে?
অবিশ্বাস্য শোনালেও ঠিক এই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ‘সেলাজিনেলা লেপিডাফিলা’ নামের একটি উদ্ভিদ। এর এই জাদুকরী পুনর্জন্মের ক্ষমতার কারণে একে বলা হয় ‘রিসারেকশন প্ল্যান্ট’ বা ‘পুনরুত্থান উদ্ভিদ’। আজ থেকে শত শত বছর আগে স্প্যানিশ ধর্মপ্রচারকরা আমেরিকার আদিবাসীদের কাছে যিশুখ্রিস্টের পুনর্জন্মের ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে এবং তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে এই অলৌকিক উদ্ভিদটিকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতেন।
বর্তমান যুগেও মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি খয়েরি রঙের মরা গাছকে চোখের সামনে তরতাজা সবুজ হয়ে উঠতে দেখা যেখানে চরম বিস্ময়ের, সেখানে বহু শতাব্দী আগে মানুষের কাছে এটি ছিল সাক্ষাৎ এক অলৌকিক ঘটনা।
‘অডিটি সেন্ট্রাল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উদ্ভিদটি মূলত মেক্সিকোর চিলহুয়াহুয়ান মরুভূমির চরম শুষ্ক আবহাওয়ায় বেঁচে থাকে। পানির তীব্র সংকটে পড়লে গাছটি নিজের ভেতরের প্রায় ৯৫ শতাংশ পানি হারিয়ে ফেলে এবং গুটিয়ে গিয়ে একটি বলের মতো আকৃতি ধারণ করে। তখন এর পাতাগুলো চামড়ার মতো খয়েরি রঙের হয়ে যায় এবং খালি চোখে গাছটিকে সম্পূর্ণ মৃত মনে হয়।
এভাবে কোনো রকম পানি ছাড়াই গাছটি কয়েক বছর পর্যন্ত সুপ্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। কিন্তু জাদুর মতো অলৌকিক ঘটনাটি ঘটে যখন এই মরা গাছে মাত্র কয়েক ফোঁটা পানি পড়ে। পানি পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গুটিয়ে থাকা বলের মতো অংশটি ডালপালা মেলতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে এটি তার প্রাণবন্ত সবুজ রঙ ফিরে পায় এবং আবারও স্বাভাবিকভাবে সালোকসংশ্লেষণ বা খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে একটি উদ্ভিদবিদ্যা সংক্রান্ত বিস্ময় হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এই উদ্ভিদের এমন অবিশ্বাস্য সহনশীলতার পেছনে রয়েছে দুটি বিশেষ রাসায়নিক উপাদান- ট্রেহালোস এবং বেটেইনস। এর মধ্যে ট্রেহালোস হলো এক ধরনের স্ফটিক চিনি, যা উদ্ভিদের টিস্যু বা কোষে পানির বিকল্প হিসেবে কাজ করে এবং তীব্র শুষ্কতায় লবণের আধিক্যের কারণে কোষের যে ক্ষতি হওয়ার কথা, তা থেকে গাছটিকে রক্ষা করে।
অন্যদিকে বেটেইনস নামক উপাদানটিও তীব্র খরা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে গাছের ভেতরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই উদ্ভিদের টিকে থাকার কৌশল এখানেই শেষ নয়; যদি মরুভূমির চরম খরা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন এটি নিজেকে মাটি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা উপড়ে ফেলতে পারে। এরপর এটি একটি গোল বলের মতো হয়ে বাতাসের তোড়ে মরুভূমির বুকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে বেড়ায়।
এভাবে উড়তে উড়তে যখন এটি কোনো তুলনামূলক আর্দ্র বা অনুকূল পরিবেশ পায়, তখন সেখানে আবার শিকড় গজিয়ে নতুন করে বেড়ে উঠতে শুরু করে।
তবে এই রিসারেকশন প্ল্যান্ট কিন্তু অমর নয়। সময়ের সাথে সাথে এবং বারবার এই ধরনের খরা মোকাবিলার কারণে গাছটির বেঁচে ওঠার ক্ষমতা কমতে থাকে। সাধারণত কয়েক ডজন বার মরে গিয়ে আবার বেঁচে ওঠার পর গাছটি একসময় স্থায়ীভাবে মারা যায়।
এছাড়া যদি আবহাওয়া হঠাৎ করে খুব দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং গাছটি নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার বা শীতনিদ্রার প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় না পায়, তবে সে প্রথমবারেই মারা যেতে পারে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৃষ্টি প্রমাণ করে, প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে জীবজগৎ কতটা অবিশ্বাস্য রূপ ধারণ করতে পারে।




