দরকষাকষির মাস্টার আরাঘচি, কাঁধে তার ইরান রক্ষার ভার

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরঘচি
ইরানের ঐতিহাসিক শহর ইস্পাহানের এক কার্পেট ব্যবসায়ীর ছেলে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুক্রবার পাকিস্তানে হতে যাওয়া শান্তি আলোচনায় পার্লামেন্ট স্পিকারের সঙ্গে অংশ নেবেন তুখোড় এই কূটনীতিক।
অতীতে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন ‘কঠিন দরকষাকষির মাস্টার’ হিসেবে। আবার তার সেই বুদ্ধিমত্তার দ্বারস্থ ইরান। অতীতের মতো এবারও কি তিনি তার দেশকে পথ দেখাতে পারবেন?
তার আগে দেখে নেওয়া যাক দরকষাকষি নিয়ে আরাঘচির দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি ইরানের শান্তিচুক্তির আলোচনার কৌশলকে হাট-বাজারের দরদাম করার কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেন। বলেছেন, এখানে প্রয়োজন ধৈর্য এবং দীর্ঘ সময়।
প্রসঙ্গটি এসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির কারণে। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশই। যা সাময়িকভাবে স্থিমিত করেছে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এক ভয়াবহ যুদ্ধকে।
এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সৃষ্টি করেছে নজিরবিহীন বিপর্যয়।
তেহরান জানিয়েছে, প্রভাবশালী সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধি দল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেবে।
কারণ শুরু থেকেই ওয়াশিংটনের প্রতি তাদের রয়েছে গভীর অবিশ্বাস।
গত মাসে পাকিস্তানের অনুরোধে ইসরায়েল, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরঘচি ও স্পিকার গালিবাফকে তাদের টার্গেট তালিকা থেকে সরিয়ে নেয় বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
ফলে, যুদ্ধের সময় বহু শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হওয়ার পর, জীবিত নেতাদের মধ্যে এখন আলোচনায় অংশ নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নেতাই আছেন।
২০২৪ সাল থেকে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আরাঘচি। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেন।
এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ছিল ইরানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক বিরোধের সমাধান।
যদিও হয়নি সমাধান। যুদ্ধ নেমে আসে। তবে লড়াই শেষে দুই পক্ষকে আবার বসতে হচ্ছে আলোচনার টেবিলে। সেই বৈঠকের আগেই আবার আলোচনায় দরকষাকষির মাস্টার!
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যেখানে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নেয় নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে। তবে ট্রাম্প ২০১৮ সালে সেই চুক্তি থেকে বের করে আনেন যুক্তরাষ্ট্রকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনে পড়াশোনা করা আরঘচি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একজন। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব আরঘচির কৌশলী ও সূক্ষ্ম দরকষাকষির দক্ষতার ওপর আস্থা রাখে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত হওয়া আরাঘচির বই ‘দ্যা পাওয়ার অব নেগোসিয়েশন’-এ তিনি লিখেছেন, ইরানের দরকষাকষির ধরন বাজারের স্টাইলে হওয়া উচিত। অর্থাৎ ধারাবাহিক ও অবিরাম দরদামের দরকার পড়ে এই সব চুক্তিতে।
তিনি তার মায়ের দরদামের দক্ষতার কথাও স্মরণ করেন নিজের বইয়ে।
তবে দর কষাকষির কথা বলতে গিয়ে সতর্ক করে আরাঘচি তার বইয়ে এও লেখেন, রোদে দাঁড়িয়ে বরফ বিক্রির সময় অতিরিক্ত দরদাম করতে গেলে তাতে ক্ষতিই হবে বেশি।
প্রায় এক দশক আগে পারমাণবিক আলোচনার সময় থেকেই আরাঘচি কঠিন দরকষাকষির একজন মাস্টার হিসেবে পরিচিতি পান। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, তিনি সিরিয়াস, কৌশলগত জ্ঞানসম্পন্ন এবং সরাসরি কথা বলতে পটু।
১৯৬২ সালে তেহরানে জন্ম নেওয়া আরাঘচি ১৭ বছর বয়সে ইরানিয়ান বিপ্লবে অংশ নেন এবং পরবর্তী সময়ে ইরান-ইরাক যুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এরপর তিনি শুরু করেন কূটনৈতিক ক্যারিয়ার।
আরাঘচি ফিনল্যান্ড ও জাপানে দায়িত্ব পালন করেছেন রাষ্ট্রদূত হিসেবে। ২০১৩ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হন তিনি। পরে নিযুক্ত হন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে।
ব্রিটেনের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন আরাঘচি।
যদিও তিনি ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি, তবুও তিনি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। সুসম্পর্ক বজায় রাখেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে।
ঝানু এ কূটনীতিকের দক্ষতাকে বসতে হচ্ছে নতুন পরীক্ষায়। পাস করবেন নাকি ফেল তা সময়ই বলে দেবে।















