আর্টেমিসের চোখধাঁধানো চাঁদের ছবি, গবেষণা নাকি শুধু সৌন্দর্য?

সংগৃহীত ছবি
নাসা তাদের আর্টেমিস-২ চন্দ্র মিশনে নভোচারীদের তোলা চাঁদ ও পৃথিবীর দৃষ্টিনন্দন সব ছবি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষের মনোযোগ কাড়ছে এসব ছবি, যেখানে চাঁদ ও পৃথিবীকে অদ্ভুত কোণ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টতায় দেখা যাচ্ছে।
চারজন নভোচারী এমন এক অভিযানে রয়েছেন, যা তাদের ১৯৭২ সালের পর যেকোনো মানুষের তুলনায় পৃথিবী থেকে আরো দূরে নিয়ে যাবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এসব ছবির কি সত্যিই বিশেষ বৈজ্ঞানিক মূল্য রয়েছে, নাকি এগুলো মূলত ভ্রমণের স্মৃতিচিত্রের মতো?
নাসা চায়, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এই মিশনের প্রতি সমর্থন জানাক। তাই ১০ দিনের পুরো যাত্রাই সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে, আর নভোচারীরা নিয়মিত ভিডিও বার্তায় নিজেদের অগ্রগতি তুলে ধরছেন উচ্ছ্বাসের সঙ্গে।
নাসার ভাষ্য, পৃথিবী ও চাঁদকে এত কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতায় ক্রুরা এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে ওরায়ন মহাকাশযানের জানালাই নোংরা হয়ে যায়—পরে সেটি পরিষ্কার করার নির্দেশনাও তাদের দিতে হয়েছে।
এই প্রথম এত দূর মহাকাশে ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
ওরায়নে রয়েছে মোট ৩২টি ক্যামেরা ও ডিভাইস—এর মধ্যে ১৫টি মহাকাশযানে স্থায়ীভাবে বসানো এবং ১৭টি নভোচারীদের হাতে ব্যবহারের জন্য।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, তারা প্রায় ১০ বছর পুরোনো ক্যামেরা ব্যবহার করছেন, পাশাপাশি গোপ্রো ও স্মার্টফোনও রয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত হয় তাদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ছবি। ‘হ্যালো, ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের ছবিটি তুলেছিলেন মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, যখন মহাকাশযানটি পৃথিবী ও চাঁদের মাঝামাঝি অবস্থানে ছিল—পৃথিবী থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার মাইল এবং চাঁদ থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার মাইল দূরে।
ছবিতে দেখা যায়, পৃথিবী সূর্যকে আড়াল করে রেখেছে, চারপাশে অরোরার আভা, আর নিচে জ্বলজ্বল করছে শুক্র গ্রহ।
পৃথিবীকে ছবিতে উল্টো দেখা যায়—বাম দিকে সাহারা মরুভূমি ও আইবেরীয় উপদ্বীপ, আর ডান দিকে দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বাংশ।
ছবিটি নিঃসন্দেহে চমৎকার—তবে বৈজ্ঞানিকভাবে নতুন কিছু নয়।
কারণ, নাসার ডিপ স্পেস ক্লাইমেট অবজারভেটরি স্যাটেলাইটে থাকা আর্থ পলিক্রোম্যাটিক ইমেজিং ক্যামেরা (ইপিক) ২০১৫ সাল থেকেই প্রায় ১০ লাখ মাইল দূর থেকে নিয়মিত পৃথিবীর ছবি তুলে আসছে—যা আর্টেমিস-২-এর চেয়েও অনেক দূরের দৃষ্টিকোণ।
শনিবার নাসা আরেকটি ছবি প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘ইতিহাস তৈরি হচ্ছে’।
এতে দেখা যায় চাঁদের দূরবর্তী অংশের বিশাল ‘ওরিয়েন্টালে বেসিন’—যেখানে পৃষ্ঠ বেশি পুরু এবং আঘাতের চিহ্নও বেশি।
সোমবারের চন্দ্র প্রদক্ষিণের আগে এই ছবি প্রকাশ করা হয়, যখন নভোচারীরা চাঁদের অদেখা পাশ ঘুরে আসবেন এবং পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,০৬৬ মাইল দূর দিয়ে অতিক্রম করবেন।
নাসা বলছে, ‘মানুষের চোখে প্রথমবারের মতো পুরো বেসিনটি দেখা গেল।’ অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরাও কক্ষপথ ও আলোর সীমাবদ্ধতার কারণে এটি সম্পূর্ণ দেখতে পারেননি।
নাসা এখানে বিশেষভাবে ‘মানুষের চোখ’-এর গুরুত্ব তুলে ধরছে।
তাদের মতে, মানুষের চোখ ও মস্তিষ্ক রঙ, গঠন ও পৃষ্ঠের সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে অত্যন্ত সক্ষম—যা নতুন উপলব্ধি এনে দিতে পারে।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস লিনটট ভিন্ন মত দেন।
তার ভাষায়, ‘এই ছবিগুলোর মূল্য শিল্পগত—বৈজ্ঞানিক নয়।’
তিনি জানান, অ্যাপোলো যুগের পর থেকেই রোবট মহাকাশযান চাঁদের অদেখা অংশের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেছে।
২০২৩ সালে ভারতের চন্দ্রযান-৩ একই অঞ্চলের বিস্তারিত ছবি তুলেছে, আর ২০২৪ সালে চীনের চাং’ই-৬ প্রথমবারের মতো ওই অঞ্চল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে।
লিনটটের মতে, ‘অসাধারণ কিছু না ঘটলে নভোচারীদের নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ নেই।’
নাসা এসব ছবি প্রকাশের সময় মিশনের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তুলে ধরছে, তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় রয়েছে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে—দুই দেশই চাঁদে আবার মানুষ পাঠাতে চায়।
আর্টেমিস-২ সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত এগিয়ে থাকবে।
একই সময়ে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাজেট কাটছাঁটের কারণে নাসা চাপের মুখে রয়েছে। পাশাপাশি স্পেসএক্সের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নতুন মানদণ্ড তৈরি করায় নাসাকে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞান অনুসন্ধান ও প্রমাণের ওপর দাঁড়ালেও, তা কখনোই রাজনীতির প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।
১৯৬৮ সালে নভোচারী বিল অ্যান্ডার্সের তোলা ‘আর্থরাইজ’ ছবিটি যেমন বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল।
চাঁদের কাছ থেকে তোলা সেই ছবিতে দূরে ভেসে উঠতে থাকা পৃথিবীকে দেখা যায়—যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, আমরা সবাই একই গ্রহের বাসিন্দা।
একটি শক্তিশালী ছবি যে ইতিহাস গড়তে পারে, সেটিও তা প্রমাণ করে। নাসা এখন আশা করছে, আর্টেমিস-২ থেকেও তেমনই কোনো স্মরণীয় মুহূর্ত আসবে।
ততদিন পর্যন্ত, নভোচারীদের এই অসাধারণ যাত্রা এবং তাদের তোলা ছবিগুলো উপভোগ করাই যায়।















