দুর্যোগের সবে শুরু নেপালে

সংগৃহীত ছবি
নেপালের রসুয়াবাসীর জন্য দুর্যোগ সবে শুরু হয়েছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তারা তো চলেই গেছেন, যারা বেঁচে রয়েছেন তারা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন বেঁচে থাকার জন্য। খাবার নেই, পানি নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, ওষুধ, চিকিৎসা কিচ্ছু নেই। আছে শুধু কোথাও হয়তো আপনজন বেঁচে আছেন, সে আশা আর ধুকপুক করা একটা প্রাণ। শুধু রসুয়া নয়, নুয়াকোট, তানাহুন, চিতওয়ান, ধাদিং, গোরখা, নওয়ালপারসি পূর্ব ও পশ্চিম—সবখানেই একই দৃশ্য। গতকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭৫ জনে। নিখোজ প্রায় ২৪ শ। এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক রয়েছে ৩২০ জন। ভাদ্রের ১০ তারিখ (বুধবার), সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে বিকট শব্দে খসে পড়ল হিমবাহ, প্রকম্পিত হলো চারিধার। ভোটেকোশী নদী দিয়ে নেমে আসতে থাকল পাহাড়ি ঢল। ঢল তো নয়, যেন বিশালাকৃতির সর্পিল এক দানব। চলার পথে যা পাচ্ছে গিলে খাচ্ছে। মানুষ, ঘরবাড়ি, গাছপালা, পশুপাখি, রাস্তা-ব্রিজ কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছেন মানুষ। ভয়ার্ত মানুষের চিৎকার, পশুপাখির আর্তনাদ— কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সব যেন ঢাকা পড়ছে সর্পিল দানবের গর্জনে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ড. গঙ্গারাম তুলাধরের মতে, এমন দুর্যোগ যে নেপালে দেখা দেবে তা তিনি ছাত্রাবস্থায় জাপানের দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে পেরেছিলেন। তবে সে দুর্যোগ যে তার জীবদ্দশায়ই তিনি প্রত্যক্ষ করবেন, তা ভাবেননি।
ড. গঙ্গারাম তুলাধরের মতো বিশ্ববাসীও হয়তো ভাবেনি এমন দুর্যোগ তারা কখনো দেখবে। এই আকস্মিক বন্যায় আপনজন হারানোর পাশাপাশি বাড়ি, সঞ্চয়, এমনকি পেশাও হারিয়েছেন অনেকে। বন্যায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন এখন খাবার ও নিরাপদ পানীয়জল। জাতীয় দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নেপাল সেনাবাহিনীর ব্যারাকে অস্থায়ী আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানীয়জল ও ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রসুয়ার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর উল্লেখ করে নুয়াকোটভিত্তিক সাংবাদিক নবদীপ শ্রেষ্ঠা বলেছেন, বর্তমানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন সংগঠনের দেওয়া খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। প্রধান জেলা কর্মকর্তার অধীনে একদ্বার পদ্ধতিতে ত্রাণ বিতরণের জন্য সর্বদলীয় সমঝোতা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন গোষ্ঠী পৃথকভাবে ত্রাণ বিতরণ করছে। তবে আসল প্রশ্ন, ‘ত্রাণ এসেছে কি না?’এটি নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এই ত্রাণে কতদিন চলবে, আর তারপর কী হবে?’
যাদের বাড়িঘর বসবাসের আর উপযোগী নেই, তাদের অস্থায়ী আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা মানুষকে নেপাল সেনাবাহিনীর ব্যারাক ছাড়াও স্কুল, খালি জায়গা ও বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে রাখা হয়েছে— যেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষ ও বহিরাগতদের অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে রাত কাটাতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা কাঞ্চা তামাং জানালেন, কিছু সাধারণ মানুষ বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দিয়েছেন নিজেদের বাড়িতে। তবে যেসব পরিবারের বাড়ি পুরোপুরি ভেসে গেছে বা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, তাদের সামনে বাড়ি পুনর্নির্মাণ, জমির ব্যবস্থা এবং নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।
লেখক: সম্পাদক, মানবআওয়াজ।







