অন্ধকার যুগে সুদান
মোমবাতির আলোয় চলছে পড়াশোনা

খার্তুমের একটি পেট্রোল স্টেশনে জ্বালানির অপেক্ষা
সুদানের গৃহযুদ্ধ এখন পা দিয়েছে চতুর্থ বছরে। কিন্তু এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু বোমাবর্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন এখন এক গভীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে হয়ে পড়েছে স্থবির। রাজধানী খার্তুমের ঘরে ঘরে এখন অন্ধকারের রাজত্ব। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা এখন মোমবাতি, আর শ্রমজীবী মানুষের দিনের অর্ধেক সময় কাটছে তেলের লাইনে।
দক্ষিণ খার্তুমের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী হূসনা মোহাম্মদের দৈনন্দিন জীবন এখন এক অন্তহীন সংগ্রামের গল্প। প্রতিদিন ভোরে তার পাঁচ সন্তান স্কুলে যাওয়ার আগে আর স্বামী কর্মশালায় রওনা হওয়ার আগেই হূসনাকে হাতে প্লাস্টিকের বড় ড্রাম বা জেড়ি-ক্যান নিয়ে ছুটতে হয় পাড়ার মোড়ের কল থেকে পানি আনতে। একসময় ঘরে সুইচ টিপলেই ইলেকট্রিক মোটরের সাহায্যে পানি পাওয়া যেত, কিন্তু এখন টানা লোডশেডিংয়ের কারণে সেই মোটর অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
হূসনার ভাষায়, তার সারাটা দিন এখন ব্যয় হয় ছোট ছোট অভাবগুলো মেটানোর চেষ্টায়, যা দিনের শেষে এক বিশাল মানসিক ও শারীরিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎ যখন নিয়মিত ছিল, তখন ঘরের সাধারণ কাজগুলোও অনেক সহজ মনে হতো।
সুদানের এই বিদ্যুৎ বিপর্যয় হুট করে আসা কোনো সমস্যা নয়। দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিড বহু বছর আগে থেকেই নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। এর ওপর প্রায় চার বছর ধরে চলা সেনাবাহিনী এবং আধা-সামরিক বাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধ এই পতনকে আরও দ্রুততর করেছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় সুদানের ওপর বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। সুদান মূলত আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর চলে, তাই তেলের ঘাটতি আর আকাশচুম্বী দাম দেশটির অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে।
টাকার মান পতন
গত কয়েক সপ্তাহে সুদানি পাউন্ডের দাম ২০ শতাংশ কমেছে। ১ ডলারের দাম এখন কালোবাজারে ৩৯০ পাউন্ড ছাড়িয়েছে।
জ্বালানির চড়া দাম
লিটার প্রতি পেট্রোলের দাম মাত্র কয়েক সপ্তাহে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি
এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ কেজি চিনির দাম ২৮ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৫ হাজার পাউন্ড। চাল, ডাল ও ভোজ্য তেলের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকার ফলে মানুষের ঘরের ভেতরের জীবন হয়ে উঠেছে অসহনীয়। ফ্রিজ কাজ না করায় হূসনার মতো গৃহিণীরা এখন আর খাবার জমা রাখতে পারেন না। যা রান্না হয় তা সেদিনই খেয়ে ফেলতে হয়। অনেক সময় কাঠ বা কয়লার চুলায় রান্না করতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। হূসনার ১৬ বছর বয়সী বড় মেয়ে যখন সামনের বড় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোমবাতির অস্পষ্ট আলোয় পড়াশোনা করতে হচ্ছে। এই পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা কিংবা সুস্থভাবে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপার্জনের ক্ষেত্রেও অন্ধকার নেমে এসেছে। হূসনার স্বামী আহমেদ আলী একজন গাড়ি মেকানিক, যার পুরো ওয়ার্কশপটিই ছিল বিদ্যুৎ-নির্ভর। আগে লোডশেডিং হলে তিনি জেনারেটর চালিয়ে কাজ সারতেন, কিন্তু এখন জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে জেনারেটর চালানো আর লোকসান দেওয়া একই কথা। মার্চের শেষেও যে তেলের দাম ছিল লিটার প্রতি প্রায় ৪,৮৬০ পাউন্ড, তা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,৮৭০ পাউন্ডে। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি দাম বাড়ার ফলে এখন জেনারেটর চালানো সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে।
এই সংকট পরিবহন ব্যবস্থাকেও গ্রাস করেছে। বাস চালক ইয়াসির আল-বালহাউই জানান, তার দিন এখন শুরু হয় পেট্রোল স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে। রাস্তায় বাস চালিয়ে উপার্জনের চেয়ে জ্বালানি সংগ্রহের পেছনেই তার বেশি সময় নষ্ট হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় বাসের ভাড়া বাড়লেও সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা না থাকায় যাত্রী কমে গেছে। এতে করে তার সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ইয়াসিরের মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষ এখন লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা অথবা ঘরে বসে থাকা এই দুই কঠিন পরিস্থিতির মাঝে আটকা পড়েছেন।
বাজারের অবস্থাও আরও মারাত্নক। চিনি, আটা এবং রান্নার তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনতেই তাদের বিশাল খরচ হচ্ছে পরিবহন ভাড়ার কারণে। অনেক ব্যবসায়ী এখন দোকানে পণ্য তুলতেও ভয় পাচ্ছেন, কারণ তারা জানেন না পরের দিন দা ম কত হবে। যারা কিছুটা স্বচ্ছল, তারা ব্যক্তিগতভাবে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সোলার প্যানেল বসানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু খুদে বিক্রেতা বা সাধারণ হকারদের জন্য এমন কোনো সুযোগ নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদানের এই সংকটের মূলে রয়েছে সে দেশের ভঙ্গুর অবকাঠামো। অনেক এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে, যা অতিরিক্ত লোড নিতে পারে না। সামান্য গরম বাড়লে বা বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে তার পুড়ে গিয়ে পুরো গ্রিড বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে পরিষেবা উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হলেও যুদ্ধের ময়দান আর ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান ২০ শতাংশ কমে যাওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অসহায় এই পরিস্থিতিতে মানুষ এখন নিজেদের মতো করে বাঁচার উপায় খুঁজছে। বড় বড় জেনারেটর বাদ দিয়ে পাড়া মহল্লায় এখন ছোট ছোট সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে কেবল পানির পাম্প চালানোর জন্য। এই ছোটখাটো উদ্যোগগুলো মানুষের পানির অভাব কিছুটা মেটালেও পুরো এলাকার চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। সুদানের সাধারণ মানুষের কাছে এই বিদ্যুৎ সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি তাদের জীবনের এক নিষ্ঠুর ও স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যা তারা প্রতিদিন বহন করতে বাধ্য হচ্ছে।


