বিরল ওরাংওটানের শত্রু যখন প্রবল বৃষ্টি

ছবি: রয়টার্স
শিকারি নয়, বনের আগুনও নয়, বিরলতম টাপানুলি ওরাংওটানের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বৃষ্টি। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে টানা চার দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহার ধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে দুর্লভ এ প্রাণীর শত শত বছরের জনবসতি।
গবেষকদের মতে, প্রজাতিটির প্রায় ৭ শতাংশ হারিয়ে গেছে ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের প্রভাবে। এখন বিলুপ্তির আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে সংকটাপন্ন এই বনমানুষ।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত ৫৮টি টাপানুলি ওরাংওটানের মৃত্যু হয়েছে ওই দুর্যোগে। যা প্রজাতিটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ।
বর্তমানে বন্য পরিবেশে টাপানুলি ওরাংওটানের সংখ্যা ৮০০টিরও কম।
গবেষকদের মতে, মৃত্যুর এ হিসাবও রক্ষণশীল। এতে ধরা হয়নি বৃষ্টির কারণে বনভূমির ছাউনির ক্ষতি ও খাদ্যসংকটের প্রভাব।
গতকাল বুধবার প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে সেনিয়ার সুমাত্রায় আঘাত হানে সাইক্লোন। এতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে মৃত্যু হয় এক হাজারের বেশি মানুষের। এটি বিবেচিত হচ্ছে ২০২৫ সালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে।
গবেষকদের মতে, এ ঘটনা প্রমাণ করে, চরম বৃষ্টিপাত হুমকি হয়ে উঠতে পারে সরাসরি বৃহৎ বনমানুষের অস্তিত্বের জন্যও। তবে বন্যপ্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা এখনও কঠিন।
ঝড়ের পর টাপানুলি ওরাংওটানের দেখা মিলছিল না বলে আগে থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও সংরক্ষণকর্মীরা। বন্যা ও ভূমিধসে অনেক ওরাংওটান ভেসে গেছে বা চাপা পড়েছে বলে তাদের ধারণা।
গত ডিসেম্বরে গবেষণার অন্যতম লেখক ও ব্রুনাইভিত্তিক সংস্থা বোর্নিও ফিউচারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক এরিক মেইয়ার্ড বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, সাইক্লোন সেনিয়ারে মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে প্রায় ৩৫টি ওরাংওটানের। সে সময় তিনি দুর্যোগকে প্রজাতিটির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে মৃতের সংখ্যা ৫৮ বলে ধারণা করা হয়েছে নতুন গবেষণায়।
ঘূর্ণিঝড়ের কয়েক সপ্তাহ পর মানবিক সহায়তাকর্মীরা মধ্য টাপানুলি জেলার পুলো পাক্কাত গ্রামে কাদা ও গাছের গুঁড়ির স্তূপের মধ্যে খুঁজে পান একটি মৃত ওরাংওটানের দেহ। এটি টাপানুলি ওরাংওটান ছিল বলে তাদের ধারণা।
সেখানে কর্মরত মানবিক সহায়তাকর্মী ডেকি চন্দ্রা বলেছেন, ‘গত কয়েক দিনে আমি অনেক মানুষের মরদেহ দেখেছি। কিন্তু এটিই ছিল প্রথম মৃত বন্যপ্রাণী। আগে ফল খেতে তারা এখানে আসত। এখন মনে হচ্ছে জায়গাটি পরিণত হয়েছে তাদের কবরস্থানে।’
মেইয়ার্ড জানান, মৃত ওরাংওটানের ছবি দেখেছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘যা আমাকে সবচেয়ে নাড়া দিয়েছে, তা হলো প্রাণীটির মুখের প্রায় সব মাংস ছিঁড়ে গিয়েছিল। কয়েক হেক্টর বনভূমি যখন বিশাল ভূমিধসে ধসে পড়ে, তখন শক্তিশালী ওরাংওটানও অসহায় হয়ে পড়ে।’
সেই সময়ে বনভূমির পরিস্থিতি নিশ্চয়ই ভয়াবহ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গবেষকদের দাবি, সাইক্লোন সেনিয়ার একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হলেও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। ভবিষ্যতেও চরম বৃষ্টিপাতের মাত্রা ও ঘনত্ব বাড়তে পারে এ অঞ্চলে। যা টাপানুলি ওরাংওটান এবং তাদের আবাসস্থলের জন্য হয়ে থাকবে বড় হুমকি।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত এ প্রজাতির জনসংখ্যা যদি প্রতিবছর ১ শতাংশের বেশি হারে কমতে থাকে, তবে তা শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এদিকে সুমাত্রার সংরক্ষিত বাতাং তোরু বনাঞ্চলে খনন, পাম তেল চাষ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণসহ বড় ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইন্দোনেশিয়া সরকার। ফলে এ প্রজাতির ওপর পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছেন গবেষকেরা।
গবেষণা প্রতিবেদনের লেখকদের মতে, সাইক্লোন সেনিয়ারের ধ্বংসযজ্ঞ দেখিয়ে দিয়েছে কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে টাপানুলি ওরাংওটান। জলবায়ু অস্থিতিশীলতা, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং প্রজাতিটির দুর্বলতা একসঙ্গে মিলেই তৈরি করেছে বর্তমান সংকট। এ হুমকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, অবশিষ্ট ওরাংওটানগুলোকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থা, জলবায়ু-সংবেদনশীল পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে এখনও ঠেকানো সম্ভব বিশ্বের কোনো বৃহৎ বনমানুষ প্রজাতির প্রথম আধুনিক বিলুপ্তি।
সূত্র: বিবিসি





