স্কুলছাত্র থেকে হিটম্যান

ছবিঃ আগামীর সময়
বসন্তদুপুর সেদিন। আলবেনিয়ার একটি সমুদ্রতীরবর্তী পাঁচতারকা হোটেলে কফি পান করছিলেন হোটেল মালিক নিকুলাজ। এ সময় ডেলিভারি কর্মীর ছদ্মবেশে সেখানে ঢোকেন এক ব্যক্তি। শুভেচ্ছা জানান নিকুলাজকে। একটু পর সোভিয়েত পিস্তল দিয়ে পরপর ছয়টা গুলি করা হয় তাকে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে মুহূর্ত লাগেনি তার।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া ২০২৩ সালের এই হত্যাকাণ্ড ছিল দুই পরিবারের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী বিরোধের সপ্তম ঘটনা। আর যিনি এই দুঃসাহসিক কাজ করেছিলেন তার নাম রুবেন সারাইভা। একসময় শান্ত স্কুলছাত্র থাকলেও পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন সিরিয়াল কিলার।
অশুভ আলবেনীয় প্রথা অনুযায়ী, কোনো হত্যার প্রতিশোধ নিতে অপরাধীর পরিবারের পুরুষ সদস্যরা লক্ষ্যবস্তু হলে তৈরি হয় সহিংসতার অন্তহীন চক্র। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে একটি ব্রিটেনঘেঁষা চক্র। রুবেনকে সহায়তা করেছিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি নজরদারি দল।
যুক্তরাজ্যের হোম কাউন্টিজ এলাকায় বড় হন রুবেন। অভিযোগপত্র বলছে, এই হত্যাকাণ্ডে তাকে সহায়তা করে আরও চারজন ব্রিটিশ নাগরিক, যারা ‘নজরদারি দল’ হয়ে ওই হোটেলে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। তাদের মধ্যে একজন তরুণী ও ব্যক্তি ছিলেন। তারা হোটেল মালিকের ১৩ বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটিশ নাগরিকদের বেছে নেওয়া হয়, কারণ নিকুলাজ স্থানীয় ভাড়াটে খুনিদের বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। তবে ইংল্যান্ড থেকে আসা দর্শনার্থীদের সন্দেহ করতেন না।
আর এই হামলার নেপথ্যে বার্মিংহামভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বী লেকস্টাকাজ পরিবারভুক্ত এডমন্ড হাখিয়ার নামই উঠে এসেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন বহু বছর আগে তার এক আত্মীয়কে হত্যা করেছিলেন নিকুলাজ। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্যক্তিরা এই হত্যাকাণ্ডে প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কারাগারেই সুরক্ষা
হত্যাকাণ্ডের আগে রুবেন কয়েকদিন ধরে কাছাকাছি একটি সিঁড়িঘরে ছিলেন। হামলার পর তিনি মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান। পায়ে হেঁটে প্রবেশ করেন গ্রিসে। সেখান থেকে পৌঁছান মরক্কোয়। ২০২৩ সালের শেষদিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রত্যর্পণ করা হয় আলবেনিয়ায়। প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় রুবেনকে।
কারাগার থেকে তিনি অভিযোগ করেন, তাকে দিনে ২৩ ঘণ্টা একা রাখা হয়। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, সুরক্ষার জন্যই তাকে এভাবে রাখা হয়েছে, কারণ যারা এই হত্যার অর্থ দিয়েছিল তারা তাকে ‘চুপ করিয়ে’ দিতে পারে এবং তাকে হত্যার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছে।
অপরাধজগতে সংযোগ
প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত রুবেন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, কেবল বেড়াতেই তিনি আলবেনিয়ায় গিয়েছিলেন।
তার ভাষ্য, শৈশবেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনই করছিলেন। তবে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত হওয়া এবং ছুরিকাঘাতের ঘটনায় কারাবরণের পর তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তার পরিবার মনে করে, কারাগার থেকেই অপরাধজগতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় রুবেনের।
পর্তুগাল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি আবার যুক্তরাজ্যে ফিরে যান। সেখান থেকে আলবেনিয়ায়। ওখানেই কথিত সহযোগীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেন।
সিসিটিভি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় তাকে ঘটনাস্থলের আশপাশে একাধিকবার দেখা গেছে। তদন্তকারীরা বিভিন্ন স্থানে তার উপস্থিতির ডিএনএ প্রমাণ পেয়েছে, তবে তার আইনজীবীরা দাবি করেন, সরাসরি রুবেনকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে— এমন কোনো প্রমাণ নেই।
কানুনের গল্প
পঞ্চদশ শতাব্দীর একটি আইনগ্রন্থ ‘কানুন’। ওই গ্রন্থে অশুভ আলবেনীয় প্রথার বিষয়টি এসেছে। সেখানে পারিবারিক বা গোত্রগত বিরোধের জেরে ‘রক্তের বদলা রক্ত’ নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। মূলত যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিহিংসা ও সহিংসতার নিষ্ঠুর চক্র সৃষ্টি করত।
১৯৯৭ সালে মাত্র ১৫ পাউন্ডের একটি বকেয়া জ্বালানি বিল নিয়ে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী বিরোধ থামার লক্ষণ নেই। নিকুলাজের মৃত্যুর পর আরও দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। যদিও হাখিয়া এবং অন্য ব্রিটিশ সন্দেহভাজনরা যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে প্রত্যর্পণ চেয়ে লড়াই করছেন।
অন্যদিকে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নিকুলাজের পরিবার। তার ভাইকে হত্যার জন্য ১৭ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে— এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। নিকুলাজের মেয়েরা আশঙ্কা করছে, কানুনের এই শেষ না হওয়া গল্প থেকে রেহাই পাবে না পরবর্তী প্রজন্মও।















