কংগ্রেস ছাড়াই দেশ চালানোর ছক ট্রাম্পের!
- ভোটের আগেই হোয়াইট হাউজে গোপন প্রস্তুতি
- কংগ্রেসে বিরোধীদের জয় হলেও নিজের পথেই চলবেন ট্রাম্প, তৈরি হচ্ছে বিকল্প পরিকল্পনা
- নির্বাচনে ধাক্কার আশঙ্কা, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে শাসনের পথ খুঁজছেন ট্রাম্প

ছবি: রয়টার্স
ফল তো দূরের কথা, এখনো ভোটই হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের। অথচ ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দে শুরু হয়ে গেছে ভোট-পরবর্তী হিসাব। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণবিরোধী ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেলে কী করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প? হোয়াইট হাউজের জবাব, আইনসভার নতুন অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতাকেই কাজে লাগানোর প্রস্তুতি। বাইরে নির্বাচনী প্রচার, ভেতরে বিকল্প শাসনের নকশা। আমেরিকার গণতন্ত্রে তাই নতুন প্রশ্ন— ভোটে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালেও কত দূর একাই এগোতে পারবেন প্রেসিডেন্ট?
রবিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশেষ অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয়কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারেন— এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে এপ্রিল থেকেই পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও দুজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছেন উপপ্রধান কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার, বাজেটপ্রধান রাসেল ভোট এবং হোয়াইট হাউজের আইনজীবীরা। প্রধান আইন উপদেষ্টা উইল শার্ফের দল খতিয়ে দেখছে, কোন সিদ্ধান্ত ট্রাম্প একাই নিতে পারবেন, ক্ষমতার সীমা কতটা প্রসারিত করা যাবে এবং আদালতে আপত্তি উঠলে কীভাবে তা মোকাবিলা করা হবে।
পরিকল্পনায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বায়ুকলের আমদানিতে নতুন শুল্ক আরোপ, বিদেশি শিক্ষার্থী এবং অস্থায়ী কর্মীদের ভিসায় কঠোরতা ও বাড়ি নির্মাণের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ। সরকারি অনুদান বণ্টনের নিয়ম বদলে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের প্রভাব বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে বিবেচনায়। রাসেল ভোট পরীক্ষা করছেন, কংগ্রেস আগে যে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে, তা ব্যবহার করে নতুন আইন ছাড়াই কোন কোন কর্মসূচি চালানো যায়। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর এরই মধ্যে নির্বাহী পদক্ষেপের প্রস্তাব ও আইনি পর্যালোচনা জমা দিয়েছে। ট্রাম্প নিজেও এসব আলোচনা সম্পর্কে অবগত এবং এতে অংশ নিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মধ্যেও এভাবে শাসন করতে তিনি কতটা স্বচ্ছন্দ থাকবেন? রয়টার্সের এক সূত্রের উত্তর, ‘খুবই স্বচ্ছন্দ’।
কিন্তু এই প্রস্তুতির অন্যদিকও আছে। ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ট্রাম্প, তার সহযোগী কিংবা অর্থদাতাদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত, শুনানি ও নথি তলব করতে পারেন। সেই আশঙ্কায় কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের প্রশ্ন ও তলব মোকাবিলার নির্দেশনা দিচ্ছেন আইনজীবীরা। ব্যক্তিগত উপদেষ্টাদের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ গোপন রাখার আইনি সুযোগও খোঁজা হচ্ছে।
রিপাবলিকানদের বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে ২১৮-২১৪ এবং সিনেটে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। উভয়কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে তাদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত মিললেও সিনেটের ফল অনিশ্চিত। কয়েক সপ্তাহ ধরে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউজ অবশ্য পরাজয়ের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। মুখপাত্র লরেন বিস বলেছেন, সীমান্ত সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা ও সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার পর শুল্ক, অভিবাসন, সরকারি চাকরি সংকোচন ও পররাষ্ট্রনীতিতে নির্বাহী ক্ষমতার ব্যাপক প্রয়োগ করেছেন ট্রাম্প। তবে বড় কর ছাড় ও ব্যয়সংক্রান্ত আইন পাসের জন্য রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সমর্থন প্রয়োজন হয়েছিল। নির্বাচনবিশ্লেষক নাথান গঞ্জালেসের মতে, ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেই শাসন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
তবু কংগ্রেসকে পুরোপুরি অকার্যকর করা সম্ভব নয়। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে জয়ী হলে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন। আইনসভার তদন্তও চলতে পারে। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া নির্দেশ আদালত বাতিল করতে পারেন।
নির্বাচনের আগে তাই ওয়াশিংটনে চলছে দ্বিমুখী প্রস্তুতি। একদিকে ভোটারদের রায় চাইছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে সেই রায় প্রতিকূল হলে কীভাবে নিজের কর্মসূচি এগিয়ে নেবেন, তার পথ আঁকছেন সহযোগীরা। গণতন্ত্রে ক্ষমতার পালাবদল শুধু আসনের হিসাব নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচিত আইনসভা বাধা দিলে প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তের সীমা কোথায়?



