নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জিতলে কি ঘটবে

ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে অবস্থিত মার্কিন কংগ্রেস ভবন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩ নভেম্বর। কংগ্রেসের ৩৫টি সিনেট সিট ও হাউজের ৪৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের প্রার্থীর্তা নেই। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে সাধারন নির্বাচনে ২০২৮ সালে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কমলা হারিসকে হারিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ৪ বছরের মেয়াদে ট্রাম্প পার করলেন ২ বছর। আরও ২ বছর ক্ষমতায় থাকবেন। তা’হলে মধ্যবর্তী এই নির্বাচন কেন এতও গুরুত্বপূর্ন। কেনইবা কংগ্রেসের সংখ্যাগলিষ্ঠতা রিপাবলিকানরা হারাতে বসেছে। ডেমোক্র্যাটরা জিতলে কি হতে পারে। তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট করেছে রয়টার্স।
নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মতে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস) জয়ী হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি তারা সিনেটের নিয়ন্ত্রণও পেতে পারে। রিপাবলিকানদের দুই বছরের আধিপত্যের পর এটি তাদের ওয়াশিংটনে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ করে দেবে। আর এতে সিনেট ও হাউজে রিপাবলিক্যানদের দখলে থাকা যথাক্রমে ৪ ও ৭টি আসনে থাকা আসনে জিততে হবে ডেমোক্র্যাটদের। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রন নিলে বড় পরিবর্তন আসবে বিদেশ নীতিতে।ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
ইরান যুদ্ধের লাগাম টানা
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন নেননি। ডেমোক্র্যাটরা বারবার এমন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যাতে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যাবে না। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থন নিয়ে পাসও হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তা উপেক্ষা করেছে।
প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা ব্যয় কমিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। যাতে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুমতি নিতে বাধ্য হন। এছাড়া, তারা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনসমক্ষে হাজির হয়ে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্যও বাধ্য করতে পারেন
ইউক্রেনকে নতুন সহায়তা প্রদান
রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইরত ইউক্রেনকে দেওয়া সরাসরি আর্থিক ও সামরিক সহায়তা ট্রাম্প প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। যদিও ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেই ইউক্রেনকে সমর্থনের বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।
সর্বশেষ ঘটনায়, ট্রাম্প রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন এবং রুশ জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো আইনে পরিণত করার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা শিথিল করেছেন। এই পদক্ষেপ কংগ্রেসের অনেক সদস্যকে, এমনকি অনেক রিপাবলিকানকেও ক্ষুব্ধ করেছে। নভেম্বর মাসে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে জয়লাভ করলে, ডেমোক্র্যাটরা নির্ধারণ করতে পারবেন কোন বিষয়গুলো নিয়ে এবং কখন ভোটাভুটি হবে।
এর ফলে তারা ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা অনুমোদন করতে পারবেন। যা সম্ভবত দুই—তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাস হবে—যে পরিমাণ সমর্থন ট্রাম্পের ভেটো (নিষেধাজ্ঞা) ক্ষমতাকে অকার্যকর করার জন্য প্রয়োজন।
এছাড়া তারা ট্রাম্পের অন্যান্য কর্মকাণ্ডকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, নিউইয়র্কের প্রতিনিধি গ্রেগরি মিক্স—যিনি ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ‘হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ বা প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান হতে পারেন—তিনি একটি দ্বিদলীয় আইন প্রস্তাব করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, রাশিয়ার ডিজেলকে পুনরায় বিশ্ববাজারে ফিরিয়ে আনার ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে বাধা দেওয়া।
ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করা
গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের আচরণের কারণে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে কমে গেছে; এই যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল—অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে রিপাবলিকানদের ঘনিষ্ঠ মিত্রতাও এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
ডেমোক্র্যাটরা ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা সীমিত করতে পারেন বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারেন। সর্বশেষ অর্থবছরে এই সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার—যা অন্য যেকোনো দেশকে দেওয়া সহায়তার চেয়ে বেশি।
এই গ্রীষ্মে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলের সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। যারা এই উদ্যোগের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে গ্রেগরি মিক্সের মতো কেউ কেউ আবার ইসরায়েলকে ভারী বোমার মতো অস্ত্র সরবরাহের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
সামরিক ব্যয় সীমিত করা এবং বৈদেশিক সহায়তা পুনরুদ্ধার করা
ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের সামরিক ব্যয় সীমিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ট্রাম্প এ বছর সামরিক বাজেট ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন—যা ছিল নজিরবিহীন। তবে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে এটি আটকে দেন। তাদের যুক্তি ছিল, ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্প কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেননি এবং তিনি সামাজিক কর্মসূচিগুলোতে বড় ধরনের বাজেট কাটছাঁট করেছেন।
ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদিত কয়েক বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সহায়তাও আটকে দিয়েছেন বা বাতিল করেছেন। অনেক ডেমোক্র্যাট এই কাটছাঁটের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং তারা এই তহবিল পুনরায় চালুর চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হতে পারেন ট্রাম্প
ডেমোক্র্যাটরা জিতলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারে। এমন আশংকার কথা ট্রাম্প অনেক আগেই বলেছেন। জনস্বার্থ ও সংবিধান বিরোধী যেকোন কাজের জন্য তা করতে পারবে কংগেসের সংখাগরিষ্ঠ দলটি।
বিচারক নিয়োগে বাধা
কোন বিচারপতি নিয়োগে সিনেটের অনুমতি অপরিহার্য। ডেমোক্র্যাটরা জিতলে ট্রাম্প সে সুযোগ হারাবেন।
কংগ্রেসের কমিটিতে চেয়ারম্যান
ফরেন রিলেশন সহ কংগ্রেসের কমিটিগুলোতে সভাপতি হবেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যরা। বাজেট প্রনয়ন সহ গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত আসে এই কমিটি থেকে। প্রতিটি পদক্ষেপে ট্রাম্পকে ডেমোক্র্যাটদের দ্বারস্থ হতে হবে।



