মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প কি রিপাবলিকানদের জন্য বোঝা?

ছবি: রয়টার্স
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রিপাবলিকান ভোটারদের প্রভাব স্পষ্ট। দলের প্রাইমারি নির্বাচনেও তিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। নিজের সমর্থন ঘোষণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট এবং জনসভায় উপস্থিতির মাধ্যমে মিত্রদের এগিয়ে দিয়েছেন, প্রতিপক্ষদের পরাস্ত করেছেন। কিন্তু প্রাইমারি নির্বাচন শেষ হওয়ার পথে এবং সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াই শুরু হতে চলায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের কাছে ট্রাম্প শিগগিরই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্তা হয়ে উঠতে পারেন—একজন ‘বোঝা’ বা রাজনৈতিক দায়।
কারণ, দোদুল্যমান ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন বেশ কম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি তার জনসমর্থনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সর্বশেষ রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, পরপর দুটি জরিপে মাত্র ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ৬৭ শতাংশই সমর্থন জানাননি। ট্রাম্পের প্রথম বা দ্বিতীয় মেয়াদে রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে এটিই সর্বনিম্ন সমর্থনের হার।
এমন পরিস্থিতিতেই আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে এবার নির্বাচন হবে ৩৩টিতে। আর হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হওয়ায় ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন হবে।
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা। হাউজে রিপাবলিকানদের আসন ২১৯টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১২টি; চারটি আসন শূন্য। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি—এর মধ্যে দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন।
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সিনেট ও হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে চাইছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ট্রাম্পের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর কৌশল নিয়েছে তারা। তাদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব।
সিনেটে নিজেদের আসন রক্ষার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে চারটি আসন এবং হাউজে ছয়টি আসন ছিনিয়ে নিতে পারলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে। এর ফলে ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণের ক্ষমতার ওপরও বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে তারা। এ কারণেই ৩ নভেম্বরের নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য তাকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সহজ নয়। কারণ, দলের মূল ভোটারদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এখনও শক্তিশালী। একই সঙ্গে দলের ভেতরে তার বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার প্রবণতাও প্রার্থীদের বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
টেক্সাসের রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রেন্ডন স্টেইনহাউজার নিউইয়র্ক টাইমসকে বলছিলেন, ‘বিষয়টি বেশ জটিল।’ তার মতে, প্রাইমারি নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা সম্ভবত প্রার্থীদের এই উভয় সংকটকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তবে তিনি মনে করেন, সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থীরা ধীরে ধীরে ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।
‘আমার মনে হয় বিষয়টি খুব সূক্ষ্ম হবে। আমার ধারণা, নির্বাচনী এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নেওয়া হবে,’ বললেন তিনি।
রিপাবলিকানদের জন্য ট্রাম্পের আরেকটি বড় আকর্ষণ তার সঙ্গে যুক্ত বিপুল অর্থের উৎস। অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের ‘সুপার প্যাক’—‘মাগা ইংক’-এর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তার আশা করছেন। বিপুল অর্থভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও সাধারণত কৃপণ হিসেবে পরিচিত এই সংস্থাটি চলতি সপ্তাহে সিনেটর ডার্লিন গ্রাহামকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রিপাবলিকান রান-অফ নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়তা করেছে। ভোটারদের কাছে ৮ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের ফোন কল ও টেক্সট বার্তা পাঠিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে সংস্থাটি।
ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে আসন্ন নির্বাচনী লড়াইয়েও ‘মাগা ইংক’-এর আরও বড় পরিসরে সম্পৃক্ত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তির মতে, চলতি মাসের শুরুতে ওভাল অফিসে ট্রাম্প তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং ‘মাগা ইংক’-এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিজ্ঞাপন নির্মাতার সঙ্গে বৈঠক করেন। ব্যক্তিগত আলোচনার বিবরণ দেওয়ার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এ তথ্য জানান। বৈঠকটির খবর প্রথম প্রকাশ করে ‘দ্য আটলান্টিক’।
বৈঠক সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, সেখানে ডেমোক্র্যাটদের এমন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়, যার লক্ষ্য নির্বাচনকে ট্রাম্পের ওপর একটি গণভোট বা ‘রেফারেন্ডাম’-এ পরিণত করা। প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দেন, বিজ্ঞাপনে তার কাজের রেকর্ড ও সাফল্যের জোরালো প্রতিরক্ষা বা ব্যাখ্যা থাকতে হবে। তবে শরৎকালের বিজ্ঞাপন প্রচারণায় ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞাপনের অংশ কতটা বড় হবে, তা তখনও স্পষ্ট ছিল না।
এই গোষ্ঠীর অর্থব্যয় রিপাবলিকানদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। বসন্ত ও গ্রীষ্মে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে চলে যাওয়ায় কঠিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মৌসুমে ‘মাগা ইংক’ অর্থ বিনিয়োগ শুরু করবে বলে তাঁরা আশা করছিলেন। তবে বিপুল অর্থব্যয়ের এই ক্ষমতা ট্রাম্পের জন্য দলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করার একটি হাতিয়ারও হতে পারে। একইভাবে, যারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কিছুটা বজায় রাখতে চান, সেই প্রার্থীদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
অতীতে ব্যাপক অজনপ্রিয়তার পর নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হওয়া ট্রাম্প এবার নিজেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। তিনি সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন ‘কল্পনা করে নেন’ যে ব্যালট পেপারে তার নামও রয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার বিশাল তহবিল থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরাও চাইছে ট্রাম্প যেন নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখেন। কারণ, তার অজনপ্রিয়তাকেই তারা রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেমি রাসকিনের ভাষায়, কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং কার্যত তার এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ‘রাবার স্ট্যাম্প’-এ পরিণত হয়েছেন।
বুধবার মিশিগানে সিনেট প্রার্থী ড. আব্দুল আল-সায়েদের নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় রাসকিন বলছিলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের রিপাবলিকান ককাসকে ঠিক যেন প্রশিক্ষিত সিলমাছের মতো নিয়ন্ত্রণ করেন। মূলত নভেম্বরের নির্বাচনটি এই বিষয়টি নিয়েই।’
অর্থাৎ, ট্রাম্প একই সঙ্গে রিপাবলিকানদের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী সম্পদ এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠেছেন। দলের মূল ভোটারদের ধরে রাখতে তার জনপ্রিয়তা ও অর্থবল প্রয়োজন রিপাবলিকান প্রার্থীদের। আবার দোদুল্যমান ভোটারদের কাছে তার অজনপ্রিয়তা তাদের জন্য নির্বাচনী বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার লড়াই নয়; এটি ট্রাম্পের ওপর এক ধরনের রাজনৈতিক গণভোটও হয়ে উঠতে পারে।









