ইরান যুদ্ধ
মানসিক চাপে বিধ্বস্ত সেনাদের নিয়ে ২৬০ দিন পর ফিরছে ‘আব্রাহাম লিংকন’

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন- রয়টার্স
২৬০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে। যুদ্ধাঞ্চলে কেটেছে প্রায় ২০০ দিন। ১০ হাজারের বেশি বিমান অভিযান, আর শত্রুর ওপর ফেলা হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড গোলাবারুদ। কিন্তু দীর্ঘ এই যুদ্ধমিশনের শেষে রণতরিটির ভেতরের চিত্র নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন—পচা খাবার, ছত্রাক ধরা ঝরনা, সরবরাহ সংকট, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং এমনকি কয়েকজন নাবিকের জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার খবর। এসব বিতর্কের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবার ফিরছে দেশে। এমন তথ্য জানিয়েছে দ্য হিল।
মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাও শুক্রবার জানান, পরিকল্পিত রোটেশনের অংশ হিসেবে রণতরিটি শিগগিরই ফিরবে যুক্তরাষ্ট্রে।
সান দিয়েগো থেকে গত নভেম্বরে যাত্রা শুরু করেছিল ‘আব্রাহাম লিংকন’। কাও বলেছেন, মিশনের প্রয়োজনেই এর মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।
তবে দীর্ঘ এই মোতায়েন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে রণতরিটির নাবিকদের কঠিন জীবনযাপনের চিত্র উঠে এসেছে। খাবার সরবরাহে সমস্যা, পচা খাবার, ছত্রাক ধরা পানির ফোয়ারা এবং কিছু নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কথা বলা হয়েছে এসব প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পর ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা রণতরিটির পরিস্থিতি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য নাবিকদের সঙ্গে কথা বলা এবং জাহাজের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে দ্বিদলীয় কংগ্রেশনাল প্রতিনিধিদল পাঠানোরও দাবি জানিয়েছিলেন।
কাও অবশ্য এসব অভিযোগের অনেকটাই খারিজ করেছেন। তার দাবি, সংবাদমাধ্যম মার্কিন সেনাদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এতে যুদ্ধ ও জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি থেকে মানুষের মনোযোগ সরে যাচ্ছে বলেও তার মন্তব্য।
তবে ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব স্বীকার করেছেন, রণতরিটিতে অল্পসংখ্যক নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তার দাবি, এতে কোনো প্রাণহানি হয়নি। তাজা খাবারের সরবরাহ না থাকলে খাবারের তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে, তবে কোনো বেলার খাবার বাদ যায়নি। অপারেশনাল ঝুঁকি বেশি থাকলে বাড়িতে ফোন করার সুযোগও সীমিত করা হয়েছিল।
‘আব্রাহাম লিংকনে’ প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন রয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা করছিল রণতরিটি। এর জায়গায় ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’কে পাঠিয়েছে পেন্টাগন। বৃহস্পতিবার মালাক্কা প্রণালি দিয়ে সেটিকে যেতে দেখা গেছে।
‘যুদ্ধ কঠিন, যুদ্ধ মানেই নরক’
কাও বলেছেন, মোতায়েনের সময় দায়িত্ব পালন করা কঠিন, আর যুদ্ধের পরিস্থিতিতে তা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। যুদ্ধকে তিনি ‘নরক’ হিসেবেও বর্ণনা করেন। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও রুটিন ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক।
তার ভাষায়, যুদ্ধে সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে পাঠানোর পর সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো—সেরা পরিকল্পনা ও যোগাযোগব্যবস্থা থাকলেও পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তা সবসময়ই থাকবে।
কাও দাবি করেন, ‘আব্রাহাম লিংকন’ যুদ্ধাঞ্চলে ২০০ দিন কাটিয়েছে, ১০ হাজারের বেশি বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। তার দাবি, রণতরিটির নাবিকদের চাকরিতে ধরে রাখার হারও অন্যান্য বিমানবাহী রণতরির তুলনায় অন্যতম সর্বোচ্চ।
তবে এর মধ্যেই রণতরিটির নাবিকদের পরিবারের উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে কাওসহ নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা রণতরিটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন—এমন ধারণা নাকচ করেছেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘না, তারা উদ্বিগ্ন নন।’
রণতরিটির মোতায়েন কি অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘না, একেবারেই যথেষ্ট দীর্ঘ হয়নি।’
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও রণতরিটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে দাবি করেছেন। তার মতে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা এবং প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করা নাবিকদের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।
তবে কাওয়ের বক্তব্যে দীর্ঘ এই মিশনের চাপের বিষয়টিও স্পষ্ট। তার ভাষ্য, মার্কিন নৌ ও মেরিন সদস্যদের ‘সীমার শেষ প্রান্তে’ ঠেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা ভেঙে পড়েননি।
এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ‘আব্রাহাম লিংকন’। কাও নাবিক ও মেরিনদের জন্য বীরের মতো স্বাগত জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, তারা ক্লান্ত হতে পারেন, কিন্তু লড়াই থেকে কখনো বেরিয়ে যাননি।







