মাশুল গোটা বিশ্বের
ইরান যুদ্ধ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আমেরিকার ভোটে নজর গোটা বিশ্বের
- কংগ্রেসে ট্রাম্পের দলের জয় কিংবা পরাজয়, দুই পরিস্থিতিতেই ভিন্ন ঝুঁকি
- ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির দাম ও বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগেও প্রভাব পড়তে পারে

‘দোষ নক্ষত্রের নয়, প্রিয় ব্রুটাস, দোষ আমাদের নিজেদের।’ শেক্সপিয়রের ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকে ক্যাসিয়াসের এই উচ্চারণ যেন এবার ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে থাকা পৃথিবীর প্রশ্ন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আমেরিকায় ভোট দেবেন মার্কিন নাগরিকেরা। অথচ তার মূল্য গুনতে হতে পারে এমন মানুষকেও, যাঁদের সেই ভোটে কোনো অধিকার নেই। ইরানের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, ঢাকার বাজারে জ্বালানির দাম, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কংগ্রেসে যে দলই জিতুক, তার অভিঘাত আটকে থাকবে না আমেরিকার সীমানায়।
ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ‘জয় যেদিকেই হোক, মূল্য দিতে হবে’ শীর্ষক বিশ্লেষণের মূল প্রশ্নও সেটি। এর সঙ্গে সোমবার (২ নভেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই প্রতিবেদন এবং গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণ মেলালে স্পষ্ট হয়, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা নয়। যুদ্ধ, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নীতিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
মঙ্গলবার প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। রিপাবলিকানরা দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ। রয়টার্সের সোমবারের হিসাবে প্রতিনিধি পরিষদে তাদের আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সিনেটে ব্যবধান ৫৩-৪৭। বর্তমান শূন্য আসনসহ হিসাব অনুযায়ী দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাল্টাতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে।
নির্বাচনী পূর্বাভাসে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বেশি। সিনেটের লড়াই অনেক বেশি অনিশ্চিত। কিন্তু পূর্বাভাস ভোটের ফল নয়। শেষ কথা বলবেন ভোটাররা।
কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের প্রশাসনকে জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। অভিবাসননীতি, শুল্ক, সরকারি ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে শুনানি ও তদন্ত শুরু করতে পারবেন বিরোধীরা। বাজেট ও প্রতিরক্ষা খরচেও দরকষাকষি বাড়বে। তবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কিংবা সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা রাতারাতি শেষ হয়ে যাবে না।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা দুই কক্ষ ধরে রাখলে ট্রাম্পের কর, শুল্ক ও প্রতিরক্ষা নীতি এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ বাড়বে। সমর্থকেরা একে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা মনে করতে পারেন। সমালোচকদের শঙ্কা, এতে যুদ্ধের ব্যয় এবং সরকারি ঋণের ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি।
ইরান সেই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে সংঘাত পুরোপুরি মেটেনি। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পেট্রলপাম্প থেকে খাবারের বাজার পর্যন্ত চাপ ফেলেছে। সেপ্টেম্বরে আমেরিকায় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। ওই মাসে দাম বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে পেট্রলের মূল্য থেকে।
কেন এই যুদ্ধ ভোটের সঙ্গে জড়িয়ে গেল? কারণ, দূরের সংঘাত এখন মার্কিন পরিবারের দৈনন্দিন খরচ। চ্যাথাম হাউসের পর্যবেক্ষণ, সাধারণত বিদেশনীতি দিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন নির্ধারিত হয় না। কিন্তু যুদ্ধ যখন ঘরের বাজারে আঘাত করে, তখন বিদেশনীতি আর দূরের বিষয় থাকে না।
সোমবার বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভোটের পর ইরানে নতুন হামলার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, কিছু শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে পরমাণু আলোচনা ফের শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আলোচনার সুযোগ এবং নতুন সংঘাতের আশঙ্কা পাশাপাশি চলছে।
গত ২০ অক্টোবর রয়টার্সকে কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে কূটনৈতিক সাফল্য না দিতে তেহরান আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে। এটিও তাঁদের দাবি, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত উদ্দেশ্য নয়। নির্বাচনের ফল ইরান নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান বদলাতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ থামানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
আরেক বড় অঙ্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ মার্কিন শেয়ারবাজারকে শক্তি দিয়েছে। কিন্তু নতুন তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা, স্থানীয় মানুষের খরচ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা নিয়ে আপত্তিও বাড়ছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জনস্বার্থ রক্ষায় জাতীয় পর্যায়ের কার্যকর নিয়ম তৈরির দায়িত্ব পরবর্তী কংগ্রেসের সামনে থাকবে।
রয়টার্সের সোমবারের আর্থিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, তথ্যকেন্দ্র ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তদন্ত বাড়তে পারে। রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে দ্রুত অনুমোদন ও অপেক্ষাকৃত কম নিয়ন্ত্রণের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রথমটি অনিশ্চয়তা, দ্বিতীয়টি অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেক মুখ নির্বাচনী বিভ্রান্তি। কৃত্রিম ছবি, নকল কণ্ঠ ও সাজানো খবর দ্রুত ছড়ানো সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের ভোটে এসব প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে ফল বদলে দিয়েছে, এমন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। আশঙ্কা আর প্রমাণকে এক করে দেখলে বিভ্রান্তিই বাড়বে।
ভোটকে ঘিরে আরেক উদ্বেগ ফল ঘোষণার প্রক্রিয়া। রয়টার্স জানিয়েছে, কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে খুব অল্প ভোটের ব্যবধান হলে গণনা, ভোটার যোগ্যতা ও ফল অনুমোদন নিয়ে মামলা হতে পারে। ট্রাম্প অতীতেও ভোট কারচুপির ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের একটি অংশ আশঙ্কা করেছেন, ফল নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েন দেশের রাজনৈতিক আস্থা ক্ষয় করতে পারে। তবে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে আদালত।
বিশ্ববাজারও তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটনে। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের দ্বন্দ্বে সরকারি অর্থায়ন বন্ধের ঝুঁকি এবং ঋণসীমা নিয়ে অচলাবস্থা বাড়তে পারে। বিপরীতে একদলীয় নিয়ন্ত্রণে ব্যয় বাড়লে সরকারি ঋণ আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার, ডলারের বিনিময়মূল্য ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে বিশ্বজুড়ে।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি বিমূর্ত নয়। হরমুজে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে আমদানি ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে। আমেরিকার শুল্ক ও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের হিসাব বদলাতে পারে। ডলারের ওঠানামা প্রভাব ফেলতে পারে আমদানি মূল্যেও। তবে এসবই সম্ভাব্য প্রভাব, নির্বাচনের ফল ঘোষণা হওয়ার আগেই নিশ্চিত ক্ষতির হিসাব নয়।
শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ভোটকেন্দ্রে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের রাজনৈতিক রং। কিন্তু তার ছায়া পড়বে যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে, প্রযুক্তির ভবিষ্যতে, বিশ্ববাজারে। শেক্সপিয়রের সেই সংলাপ আবার প্রশ্ন তোলে, ভাগ্যের দায় কি নক্ষত্রের, নাকি মানুষের সিদ্ধান্তের? আমেরিকার ভোটাররা নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেবেন। সেই সিদ্ধান্তের মূল্য কত দূরের মানুষকে দিতে হবে, তার উত্তর এখনও অজানা।



