যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রশাসনে দায়িত্ব পেয়ে গর্বিত বাংলাদেশি-আমেরিকান ড. আনজুমান ইসলাম

ড. আনজুমান ইসলাম
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের রেসিন কাউন্টির নির্বাচনী প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশি-আমেরিকান ড. আনজুমান ইসলাম। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত তিনি। তার কাছে এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বেরও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
আগামী সময়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. আনজুমান ইসলাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তার জন্য বিশেষ সম্মানের। একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে পারা তাকে নতুনভাবে গর্বিত করেছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন। তার অভিজ্ঞতায়, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণের দিনের ওপর নির্ভর করে না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ভোটারদের সচেতনতা, দক্ষ ভোট গণনা এবং দ্রুত ফলাফল ঘোষণার সমন্বিত ব্যবস্থা।
ভোটগ্রহণ থেকে ফলাফল ঘোষণা—প্রতিটি ধাপেই শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা
ড. ইসলাম বলেন, “আমার অভিজ্ঞতায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে শুরু করে ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও দায়িত্ববণ্টন অনুসরণ করা হয়।”
নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মীদের প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণ তাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। নির্বাচন কর্মকর্তা, নির্বাচন পরিদর্শক এবং নগর ও কাউন্টি পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রত্যেকেই নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন, কোন পর্যায়ে কী করতে হবে এবং কীভাবে পুরো প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে—এসব বিষয়ে তাদের প্রস্তুতি ছিল সুস্পষ্ট।
ড. ইসলামের ভাষায়, “পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমার কাছে মনে হয়েছে একটি ধারাবাহিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা— প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে শপথ গ্রহণ থেকে শুরু করে সেই শপথের মাধ্যমে অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্বের যথাযথ প্রয়োগ পর্যন্ত। অর্থাৎ, ‘শপথ থেকে দায়িত্ব পালন’।
তিনি মনে করেন, শপথ গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রশাসনিক কর্তৃত্ব গ্রহণ, দায়িত্বের স্বীকৃতি এবং সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলনই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
ভোট গণনার পদ্ধতি এবং দ্রুত ফলাফল ঘোষণার ব্যবস্থাও তার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে। তার মতে, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে স্বচ্ছতার সঙ্গে ভোট গণনা এবং দ্রুত ফলাফল প্রকাশ একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অপরিহার্য অংশ।
ভোটারদের সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ
নির্বাচনী প্রশাসনের পাশাপাশি ভোটারদের সচেতনতা ও প্রস্তুতিও তাকে আকৃষ্ট করেছে।
তিনি জানান, এবারের ব্যালটে মোট আটটি নির্বাচনী প্রতিযোগিতা (Races) এবং জনগণের সরাসরি সিদ্ধান্তের জন্য তিনটি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতগুলো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও ভোটাররা প্রার্থী ও প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে জানার জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় করেছেন।
তারা শুধু প্রার্থীর দলীয় পরিচয় বা নির্বাচনী প্রচারণার বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেন না। বরং প্রার্থীর নীতি ও পরিকল্পনা, অতীত কর্মকাণ্ড, শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা এবং নির্বাচনী প্রচারণার অর্থায়নের উৎস সম্পর্কেও খোঁজখবর নেন। একইভাবে, ব্যালটে থাকা প্রস্তাবগুলোর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করেন।
ড. ইসলাম বলেন, “এখানে ভোট দেওয়াকে মানুষ শুধু একটি অধিকার হিসেবে দেখে না; বরং গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। একজন ভোটার কাকে ভোট দেবেন, কেন দেবেন—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রার্থী ও প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।”
ভোটারদের অংশগ্রহণের আরেকটি দিক তাঁকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। নির্বাচনের দিন সরকারি ছুটি না থাকলেও মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য নিজেদের সময় বের করে নেন। কেউ কর্মস্থলে যাওয়ার আগে, কেউ কাজ শেষে, আবার কেউ দুপুরের বিরতিতে ভোটকেন্দ্রে যান।
তার ভাষায়, “এখানে মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই ভোট দেওয়ার জন্য সময় বের করে নেয়। আমার কাছে এটি নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।”
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা প্রসঙ্গে ড. ইসলাম মনে করেন, একটি স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে শুধু ভোটের দিনের আয়োজন নিয়ে ভাবলে চলবে না। নির্বাচনের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তার মতে, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, নিয়মতান্ত্রিক ভোটগ্রহণ, স্বচ্ছ ও দক্ষ ভোট গণনা এবং দ্রুত ফলাফল ঘোষণার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
একই সঙ্গে ভোটারদের মধ্যেও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। ভোটাররা যেন প্রার্থীর দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নীতি ও পরিকল্পনা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা থেকে। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, প্রশিক্ষিত জনবল, জবাবদিহি এবং সচেতন ভোটার।
বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে বিশেষ গর্ব
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে দেশটির রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ড. আনজুমান ইসলাম। তাঁর কাছে এই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন ছিল একই সঙ্গে পেশাগত, নাগরিক ও ব্যক্তিগত গর্বের বিষয়।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হয়েও যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের নির্বাচনী প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারা তাঁর জন্য বিশেষ সম্মানের। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থা কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়নি, বরং একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কীভাবে প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ববোধ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে ওঠে, তা সরাসরি উপলব্ধি করার সুযোগ দিয়েছে।
ড. আনজুমান ইসলামের এই অভিজ্ঞতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন শুধু ব্যালট বাক্সে নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল জনবল, সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, স্বচ্ছ ভোট গণনা, দ্রুত ফলাফল ঘোষণা এবং সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ।
শপথের মাধ্যমে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব গ্রহণ থেকে সেই কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ, ভোটগ্রহণ থেকে ফলাফল ঘোষণা—প্রতিটি ধাপে নিয়ম, প্রস্তুতি ও জবাবদিহির সমন্বয়ই একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থার ভিত্তি। আর সেই ব্যবস্থার অংশ হতে পারা একজন বাংলাদেশি-আমেরিকানের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের।



