ভোটে জিতেও হার
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিস্ময়কর ইতিহাস!
- নির্বাচনের পর ১৩ মাসে মৃত্যু হয় ১৪ নির্বাচিত আইনপ্রণেতার
- উপনির্বাচনে তিনটি রিপাবলিকান আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় ডেমোক্র্যাটরা
- ১৯৩০ সালের ফল বদলে যায় ১৯৩১ সালে, বদলে যায় মার্কিন রাজনীতির গতিপথ

‘গৌরবের সব পথই শেষ পর্যন্ত কবরের দিকে যায়।’ প্রায় পৌনে তিনশ বছর আগে লিখেছিলেন ইংরেজ কবি টমাস গ্রে। তাঁর সেই অমোঘ পঙ্ক্তি যেন একদিন অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল আমেরিকার রাজনীতিতে। ভোটের বাক্সে জয়। ক্ষমতা ধরে রাখার উল্লাস। অথচ সংসদের নতুন অধিবেশন শুরুর আগেই একের পর এক মৃত্যুসংবাদ! ১৩ মাসে মারা গেলেন ১৪ জন নির্বাচিত আইনপ্রণেতা। খালি হলো আসন। আবার ভোট হলো। বদলে গেল সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, যে দল নির্বাচনে জিতেছিল, ক্ষমতা চলে গেছে তার প্রতিপক্ষের হাতে! কোনো রাজনৈতিক উপন্যাস নয়। ১৯৩০ সালের আমেরিকায় ঘটেছিল এমনই বিস্ময়কর ঘটনা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মার্কিন ইতিহাসবিষয়ক সাময়িকী হিস্টরিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই অবিশ্বাস্য অধ্যায়।
১৯৩০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভারের রিপাবলিকান দল প্রতিনিধি পরিষদে ৫২টি আসন হারিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে। তাদের আসন ছিল ২১৮টি। ডেমোক্র্যাটদের ২১৬টি। একটি আসন পায় কৃষক-শ্রমিক দল।
তখন আমেরিকাজুড়ে মহামন্দার অন্ধকার। ১৯২৯ সালের শেয়ারবাজার ধসে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। বেকারত্ব ছাড়িয়েছে ১০ শতাংশ। মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। তবু অল্প ব্যবধানে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল রিপাবলিকানরা।
এরপরই শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ পর, ২৭ নভেম্বর নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা জন কোয়েল নিউমোনিয়ায় মারা যান। তার আসনে উপনির্বাচনে জয়ী ম্যাথিউ ও’ম্যালিও শপথ নেওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন।
মারা যান রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা হেনরি কুপারও। ১৯৩১ সালের মার্চে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নিকোলাস লংওয়ার্থ বলেছিলেন, ‘সম্ভবত এই মঞ্চ থেকে এটাই আমার শেষ বক্তব্য।’
তার আশঙ্কা ছিল, নতুন অধিবেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলে যেতে পারে। কিন্তু নিয়তির কী পরিহাস! পরের মাসেই মারা গেলেন লংওয়ার্থ নিজেও।
জুলাইয়ের মাত্র তিন সপ্তাহে মৃত্যু হয় আরও চার আইনপ্রণেতার। সব মিলিয়ে ১৩ মাসে মারা যান ১৪ জন। সাতজন রিপাবলিকান। সাতজন ডেমোক্র্যাট।
এদিকে মহামন্দা আরও ভয়াবহ হয়েছে। বেকারত্ব ছাড়িয়েছে ১৫ শতাংশ। প্রেসিডেন্ট হুভারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। সেই অসন্তোষ এবার আছড়ে পড়ে শূন্য আসনগুলোর উপনির্বাচনে।
মিশিগান, টেক্সাস ও নিউ জার্সিতে রিপাবলিকানদের তিনটি আসন জিতে নেয় ডেমোক্র্যাটরা।
অবশেষে আসে ১৯৩১ সালের ৭ ডিসেম্বর। নতুন প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন শুরু হলো। কিন্তু কোথায় রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা? ডেমোক্র্যাটদের আসন তখন ২১৯টি। রিপাবলিকানদের ২১৩টি। স্পিকার নির্বাচিত হলেন ডেমোক্র্যাট জন ন্যান্স গার্নার।
যে দল নির্বাচনের রাতে বিজয়ী ছিল, অধিবেশনের দিনে সেই দলই সংখ্যালঘু! মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু বুশের মতে, বিংশ কিংবা একবিংশ শতকে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।
এই পালাবদল শুধু ক্ষমতার হিসাব বদলায়নি। মহামন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তায় আইন প্রণয়নের পথও তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের অর্থনৈতিক সংস্কারের ভিত্তি গড়তেও ভূমিকা রাখে সেই কংগ্রেস।
তখন নির্বাচনের পর নতুন কংগ্রেস বসতে অপেক্ষা করতে হতো ১৩ মাস। ১৯৩৩ সালের সাংবিধানিক সংশোধনে সেই দীর্ঘ ব্যবধান কমানো হয়।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে যাচ্ছেন মার্কিন ভোটাররা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলের সামনে নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা। তবে ১৯৩০ সালের ইতিহাস ভবিষ্যতের কোনো পূর্বাভাস নয়। বরং ক্ষমতার অনিশ্চয়তার এক বিরল দলিল।
ভোটের বাক্স মানুষকে জয়ী করে। কিন্তু সেই জয়ের স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা দেয় কে? প্রায় তিন শতাব্দী আগে টমাস গ্রে যে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, আমেরিকার সেই ইতিহাস যেন তারই নির্মম স্মারক। ক্ষমতার সিংহাসন যত উঁচুই হোক, মৃত্যুর সামনে তার উচ্চতা কতটুকু?



