মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা

ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটাল হিল। ফাইল ছবি / রয়টার্স
ইতিহাসের পাতায় ক্যাপিটল হিলের রাজকীয় গম্বুজে ক্ষমতার আলো-ছায়ার খেলা সবসময়ই রোমাঞ্চকর। ব্যালট বাক্সে জমা পড়া প্রতিটি রায়ে কখনো রচিত হয় নতুন ইতিহাস, আবার কখনো ধুলোয় মিশে যায় প্রতাপশালী শাসকদের দম্ভ। মার্কিন রাজনৈতিক মানচিত্রে মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেস ও সিনেটের আসন ভাগাভাগির লড়াই নয়; এটি মূলত হোয়াইট হাউসের মসনদে থাকা শাসকের নীতির প্রতি জনগণের সরাসরি গণরায়।
এই রাজনৈতিক আদালতে একদিকে যেমন রচিত হয় প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য, তেমনি ইতিহাসের পাতায় খোদাই হয়ে থাকে পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্টদের বিপর্যয়ের করুণ চিত্র। ১৮২৬ সালের সেই ‘নীল ঢেউ’ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের রাজনৈতিক মহানাটক—মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাস মূলত হোয়াইট হাউসকে কাঁপিয়ে দেওয়ার এক প্রামাণ্য দলিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন বা বিরোধীদের জয় বাজারের স্বল্পমেয়াদি অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলতে পারে। আজ ৩ নভেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে কোন নতুন মোড় আনে এবং হোয়াইট হাউসের বর্তমান নীতিগুলোতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে পুরো বিশ্ব।
এই নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সবকটি (৪৩৫টি) আসন এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোটাভুটি হবে। এ ছাড়া প্রায় ৩৯টি অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলে গভর্নর পদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘মিডটার্ম’ নির্বাচন ক্ষমতাসীন প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ প্রকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের কংগ্রেসের কাঠামো আমূল বদলে দেওয়ার পাশাপাশি প্রেসিডেন্টদের জন্য ডেকে এনেছিল চরম বিপর্যয়। ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে ভোটারদের তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক পালাবদলের মুখে পড়েছিল ক্ষমতাসীন দলগুলো।
মার্কিন ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়া প্রেসিডেন্ট ও দলসমূহ:
১৮৬২ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতির দল সাধারণত প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ৩২টি আসন এবং সিনেটে দুইটিরও বেশি আসন হারায়। ১৮২৬ সাল থেকে অনুষ্ঠিত ৪৭টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ৪১টিতেই রাষ্ট্রপতির দলকে আসন হারাতে হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়া শীর্ষ প্রেসিডেন্ট ও তাঁদের দলের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. জন কুইন্সি অ্যাডামস (১৮২৬—প্রথম নীল ঢেউ ও ঐতিহাসিক ক্ষমতার পতন): ১৮২৪ সালের নির্বাচনের বিতর্ককে কেন্দ্র করে অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সমর্থকেরা ঐক্যবদ্ধ হন। তারা অ্যাডামস প্রশাসনকে ‘অভিজাতদের শাসক’ হিসেবে চিত্রিত করে সাধারণ কৃষক ও শ্রমিকদের ভোট টানতে সক্ষম হন।
এই নির্বাচনে জ্যাকসনপন্থীরা প্রতিনিধি পরিষদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেন এবং মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবার কোনো প্রেসিডেন্ট পদে থাকা অবস্থায় তাঁর দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে নীল ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়।
২. গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড (১৮৯৪)—মার্কিন ইতিহাসের সর্বকালের বড় পতন
মার্কিন ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আসন বিপর্যয়ের নজির গড়েছিলেন ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড। ১৮৯৩ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট এবং দেশজুড়ে বড় ধরনের কয়লা শ্রমিক ধর্মঘটের জেরে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ভোটারদের তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী বিপর্যয়। এই নির্বাচনে ক্লিভল্যান্ডের দল প্রতিনিধি পরিষদে এক ধাক্কায় বিস্ময়করভাবে ১২৫টি আসন এবং সিনেটে ৪টি আসন হারিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং রিপাবলিকানদের হাতে হাউসের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
৩. ইউলিসিস এস. গ্রান্ট (১৮৭৪)—দুর্নীতির খেসারত ও ডেমোক্র্যাটিক উত্থান
গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস. গ্রান্টের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর প্রশাসনের একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দা মার্কিন জনগণকে চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৯৬টি আসন এবং সিনেটে ১টি আসন হারায়। ফলে ডেমোক্র্যাটরা উত্তরের রাজ্যগুলোতেও বিশাল জয় পেয়ে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা হাউসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিনিয়ে নেয়।
৪. বেঞ্জামিন হ্যারিসন (১৮৯০)—শুল্ক ও মূল্যবৃদ্ধির তীব্র প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হ্যারিসনের মেয়াদে মার্কিন বাজারে ‘ম্যাককিনলি শুল্ক’ কার্যকর করার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রায় টান পড়ায় ভোটাররা হ্যারিসনের দল রিপাবলিকান পার্টিকে চরম শাস্তি দেয়। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৯৩টি আসন এবং সিনেটে ৪টি আসন হারিয়ে বড় ধাক্কা খায়।
৫. বারাক ওবামা (২০১০)—আধুনিক আমেরিকার বৃহত্তম ধস
আধুনিক মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বিপর্যয় ঘটেছিল ২০০৮ সালে বড় জয়ের পর আসা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়াদে। ২০১০ সালের এই নির্বাচনে স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার আইন পাসের প্রতিবাদে মার্কিন রাজনীতিতে ডানপন্থী ‘টি পার্টি’ আন্দোলনের ব্যাপক উত্থান ঘটে। ওবামার দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৬৩-৬৪টি আসন এবং সিনেটে ৬টি আসন হারিয়ে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়। ওবামা পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনে এই শোচনীয় পরাজয়কে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ‘চরম মার খাওয়া’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
৬. হ্যারি এস. ট্রুম্যান (১৯৪৬)—১৪ বছরের ডেমোক্র্যাটিক শাসনের অবসান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মার্কিন অর্থনীতিতে তীব্র মন্দা, পণ্যের ঘাটতি ও লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। সাধারণ জনগণের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে রিপাবলিকান পার্টি (আর সহ্য হচ্ছে না?) বিখ্যাত প্রচারণামূলক স্লোগান নিয়ে মাঠে নামে। ফলে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের দল প্রতিনিধি পরিষদে ৫৬টি আসন ও সিনেটে ১২টি আসন হারিয়ে পরাজিত হয়। এই হারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর পর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হারায়।
৭. বিল ক্লিনটন (১৯৯৪)—বিখ্যাত ‘গিংরিচ বিপ্লব’
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মেয়াদের শুরুতে স্বাস্থ্যসেবা আইন পাস করতে না পারা এবং নতুন কর আরোপের সিদ্ধান্তে ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। রিপাবলিকান নেতা নিউট গিংরিচের নেতৃত্বে ‘কন্ট্রাক্ট উইথ আমেরিকা’ এজেন্ডা নিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ঝড় তোলে রিপাবলিকানরা। এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৩-৫৪টি আসন ও সিনেটে ৭-৯টি আসন হারিয়ে বসে, যা গত ৪০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের উভয় কক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।
আধুনিক মার্কিন রাজনীতির আরও কিছু ঐতিহাসিক বিপর্যয়
জেরাল্ড ফোর্ড (১৯৭৪—ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির প্রভাব): প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের মাত্র ৩ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটারদের তীব্র রাগের মুখোমুখি হতে হয় নতুন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডকে। তাঁর দল প্রতিনিধি পরিষদে ৪৮-৪৯টি আসন ও সিনেটে ৫টি আসন হারায়। নির্বাচনে জয়ী হওয়া নতুন উদারপন্থী তরুণ ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন ইতিহাসে ‘ওয়াটারগেট বেবিজ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
জর্জ ডব্লিউ বুশ (২০০৬—ইরাক যুদ্ধ ও ক্যাটরিনা সংকট): দীর্ঘায়িত ইরাক যুদ্ধের অস্থিরতা এবং হারিকেন ক্যাটরিনা মোকাবিলায় প্রশাসনিক ব্যর্থতার খেসারত দিতে হয় বুশ প্রশাসনকে। ডেমোক্র্যাটরা এক ধাক্কায় প্রতিনিধি পরিষদে ৩০টি আসন এবং সিনেটে ৬টি আসন জিতে দুটি কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। এই পরাজয়কে বুশ আক্ষেপ করে বড় চড় বলে বর্ণনা করেছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০১৮—ডেমোক্র্যাটিক নীল ঢেউ): ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী ‘ব্লু ওয়েভ’ বা নীল ঢেউ তৈরি হয়। এতে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা ৪১-৪২টি আসন হারায় এবং নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে বড় ধরনের আইনি ও বাজেটসংক্রান্ত চাপের মুখে পড়তে হয়।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও বাজারের প্রতিক্রিয়া
ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর পর মার্কিন শেয়ারবাজার সাধারণত ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসে। ১৯৪৬ সাল থেকে প্রতিটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরের বছর শেয়ারবাজারে ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে। ট্রুইস্টের প্রধান কৌশলবিদ কিথ লার্নারের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরের পর এক বছরের গড় বৃদ্ধি ১৪.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে, ১৯৫০ সাল থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনকালীন বছরগুলোর চতুর্থ প্রান্তিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গড়ে ৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির চাপ, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সুদের হারের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
এ মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্যই পরিবর্তন করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একদিকে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের মতো বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ—এই দুইয়ের মধ্যে ২০২৬ সালের এ নির্বাচন কীভাবে হোয়াইট হাউস ও ক্যাপিটল হিলের সমীকরণ বদলে দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



