ইরান যুদ্ধের জেরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে অভিশংসনের উদ্যোগ
- ট্রাম্পের প্রশাসনেই বিদ্রোহী রিপাবলিকান
- যুদ্ধের খরচ ৩৮ বিলিয়ন ডলার

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ
ইরান যুদ্ধের আগুন এবার ঢুকে পড়ল ওয়াশিংটনের ক্ষমতার কেন্দ্রেও। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব এনেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই দলের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি। অভিযোগ—কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে হেগসেথ তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন। মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, প্রতিনিধি পরিষদে এই অভিশংসন প্রস্তাব দাখিল করেন ম্যাসি।
ম্যাসির এই পদক্ষেপ এমন সময়ে এলো, যখন ইরান যুদ্ধের আর্থিক ও সামরিক মূল্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) এর হিসাবে, ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যুদ্ধ চলতে থাকলে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
শুধু অর্থ নয়, চাপ পড়ছে মার্কিন সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারেও। সিবিও বলছে, দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্যবহৃত অস্ত্র পুনরায় মজুত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে নয়—মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরও পড়ছে।
কংগ্রেসের অনুমোদন কোথায়?
ম্যাসির অভিশংসন প্রস্তাবের মূল প্রশ্নটি হলো—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষা দপ্তর কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কতদূর সামরিক অভিযান চালাতে পারে। ম্যাসির অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতার কর্তৃত্ব উপেক্ষা করা হয়েছে।
এটি অবশ্য এখনই হেগসেথের পদ হারানোর অর্থ নয়। তবে প্রস্তাবটি প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ফলে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানদেরই প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে হতে পারে।
যুদ্ধের বিল বাড়ছেই
ইরান যুদ্ধের আর্থিক চাপ ইতোমধ্যে মার্কিন অর্থনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রে। সিবিও জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, গোলাবারুদ, উড়োজাহাজ পরিচালনা ও লজিস্টিক ব্যয়ে বড় অঙ্কের অর্থ যাচ্ছে। এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। সিবিও-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট মঙ্গলবার কংগ্রেসে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ১০ বছরের ট্রেজারি ইয়িল্ড বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক নানা কারণ রয়েছে, যার মধ্যে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির দামও রয়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের হিসাব এখন শুধু পেন্টাগনের ফাইলেই সীমাবদ্ধ নেই। ওয়াশিংটনের বাজেট, অস্ত্রের মজুত, জ্বালানি বাজার এবং মূল্যস্ফীতির আলোচনাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রিপাবলিকান শিবিরেই নতুন চাপ
হেগসেথের বিরুদ্ধে ম্যাসির পদক্ষেপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এটি এসেছে রিপাবলিকান শিবিরের ভেতর থেকেই। ম্যাসি দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক নীতির সমালোচক। এর আগে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকেও হেগসেথের বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধ নিয়ে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এখন নতুন প্রস্তাবটি প্রতিনিধি পরিষদে কীভাবে এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়। কারণ ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই সামনে আসছে তিনটি প্রশ্ন—কত খরচ হচ্ছে, কত অস্ত্র শেষ হচ্ছে এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালানোর সাংবিধানিক সীমা কোথায়।
ওয়াশিংটনে তাই ইরান যুদ্ধের পরবর্তী লড়াই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে নয়—এবার তার বড় একটি অংশ লড়াই হচ্ছে মার্কিন কংগ্রেসের ভেতরেও।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস, মার্কিন কংগ্রেস



