চীন-যুক্তরাষ্ট্র মহারণের মঞ্চ প্রস্তুত
ট্রাম্পের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটনে আসছেন শি
- ২৪ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প-শি বৈঠক
- বাণিজ্য, শুল্ক, বিরল খনিজ ও এআই নিয়ে মুখোমুখি দুই পরাশক্তি

বিশ্ব রাজনীতির দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রীয় সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২৩ সেপ্টেম্বর শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এক দশকের বেশি সময় পর কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের যুক্তরাষ্ট্রে এমন রাষ্ট্রীয় সফর হতে যাচ্ছে।
সফর ঘিরে ওয়াশিংটনে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। শি জিনপিংয়ের বিমান যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীর কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে অবতরণের পর সেখানে তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছেন ট্রাম্প। এরপর হোয়াইট হাউসে থাকবে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ। দুই নেতার বৈঠকের পাশাপাশি দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেও একাধিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে বাণিজ্য-শুল্ক
ট্রাম্প-শি বৈঠকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাণিজ্য সম্পর্ক। কয়েক বছর ধরে শুল্ক, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। দুই দেশ এরই মধ্যে কিছু বাণিজ্যিক বিষয়ে সমঝোতার পথে এগোলেও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলো পুরোপুরি মেটেনি।
আগামী বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্য সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা, কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। নভেম্বরের দিকে বর্তমান শুল্ক-সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকায় সেটিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিরল খনিজ নিয়ে বড় দর-কষাকষি
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, চিপ, সামরিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে এসব খনিজের ব্যবহার রয়েছে। চীনের সরবরাহ ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন চায় চীন থেকে বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকুক। অন্যদিকে বেইজিং এসব কৌশলগত সম্পদের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আগ্রহী। ফলে ট্রাম্প-শি বৈঠকে বিরল খনিজের সরবরাহ নিয়ে আলোচনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে।
এবার আলোচনায় এআই
চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার নতুন বড় ক্ষেত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। উন্নত এআই প্রযুক্তি, চিপ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
শির সফরের আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের মধ্যে নিউইয়র্কে আলোচনার কথা রয়েছে। সেখানে এআই, বাণিজ্য ও বিরল খনিজ নিয়ে আলোচনা হবে। শক্তিশালী এআই ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে দুই দেশ কোনো ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো বা সীমারেখা নিয়ে আলোচনা করতে পারে বলেও জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতির সম্ভাবনাও রয়েছে। জেফ বেজোস, ইলন মাস্ক, সুন্দর পিচাই, স্যাম অল্টম্যান, জেনসেন হুয়াংসহ প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতের একাধিক শীর্ষ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা রয়েছে।
তাইওয়ান ও নিরাপত্তা ইস্যুও থাকবে
বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি তাইওয়ান এবং বৃহত্তর নিরাপত্তা ইস্যুও দুই নেতার আলোচনায় আসতে পারে। তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন। ফলে এই ইস্যুতে কোনো ধরনের অগ্রগতি হবে কি না, সেটিও নজরে থাকবে।
এর পাশাপাশি জ্বালানি, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়েও দুই দেশের নেতাদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
শির সফরে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল
শি জিনপিংয়ের সফরে চীনের বড় বড় কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, ব্যাংকিং ও কৃষিপণ্য খাতের কয়েকটি বড় চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সফরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এর মধ্যে এমন কিছু কোম্পানিও রয়েছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিধিনিষেধ, নিষেধাজ্ঞা বা জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিও ট্রাম্প-শি বৈঠকের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্পের বিশেষ স্বাগত
২৩ সেপ্টেম্বর শি জিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছালে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ট্রাম্প নিজে তাকে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছেন। রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিকতায় থাকবে অভ্যর্থনা, বৈঠক ও নৈশভোজ। ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে দুই নেতার মূল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
তবে জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার আড়ালে মূল প্রশ্ন থাকবে কঠিন দর-কষাকষি। বাণিজ্য, শুল্ক, বিরল খনিজ, এআই ও তাইওয়ান—প্রতিটি ইস্যুতেই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের স্বার্থ এক নয়।
দুই নেতার বৈঠক থেকে বড় কোনো সমঝোতা আসে কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নিশ্চিত বিষয় হলো—২৩ সেপ্টেম্বর শি জিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছাবেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে মুখোমুখি বসবেন ট্রাম্প ও শি।
তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), রয়টার্স, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস



