প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলেই কাঁপতে পারে বিশ্ব অর্থনীতি
- এল নিনোয় ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা

দ্রুত শক্তি বাড়াতে থাকা এল নিনো বিশ্ব অর্থনীতির কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি করতে পারে৷
প্রশান্ত মহাসাগরের জল কয়েক ডিগ্রি বেশি গরম–শুনতে সামান্য। কিন্তু তার ধাক্কায় দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা কমতে পারে, ব্রাজিলে নামতে পারে অতিবৃষ্টি, ভিয়েতনামের কফি শুকিয়ে যেতে পারে, পশ্চিম আফ্রিকার কোকো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, পানামা খালে কমতে পারে জাহাজ চলাচল। শেষ পর্যন্ত সেই আবহাওয়ার বিল গিয়ে পড়বে মানুষের বাজারের থলি থেকে রাষ্ট্রের কোষাগার পর্যন্ত। দ্রুত শক্তি বাড়াতে থাকা এল নিনো বিশ্ব অর্থনীতির কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি করতে পারে৷ কৃষি, খাদ্য, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার অভিঘাত নিয়েই এখন নতুন করে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদেরা।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও-র সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি গড়ে উঠবে। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে এবং নভেম্বরে তা চূড়ায় পৌঁছতে পারে। ব্রিটিশ মেট অফিসের পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক, চলতি এল নিনো স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের উষ্ণ পর্যায়। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর অন্তর এর দেখা মেলে। সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে বদলে যায় বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টির ছন্দ৷ কোথাও খরা, কোথাও বন্যা, কোথাও আবার চরম তাপমাত্রা। সমস্যা হল, এ বার সেই প্রাকৃতিক চক্রের সঙ্গে আগে থেকেই উষ্ণ হয়ে থাকা পৃথিবীর জলবায়ু এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত সার, জ্বালানি ও পরিবহণ ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
সবচেয়ে আগে ধাক্কা লাগতে পারে খাবারের দামে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ বলছে, একটি সাধারণ এল নিনো শুরু হওয়ার ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রকৃত পণ্য-মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩ শতাংশ বাড়াতে পারে। জ্বালানি বাদে বৈশ্বিক পণ্যের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বাড়তে পারে এবং সেই প্রভাব টিকতে পারে ১৬ মাস পর্যন্ত। আর শক্তিশালী এল নিনো হলে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় দুই বছর উঁচু থাকতে পারে; সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হার পৌঁছতে পারে ৯ শতাংশে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে সয়াবিন, ভুট্টা ও চাল।
চিনির ক্ষেত্রেও বিপদের আশঙ্কা বেশি। ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বর্ষা দুর্বল হলে আখ উৎপাদন কমতে পারে। আবার বিশ্বের বৃহত্তম চিনি রফতানিকারক ব্রাজিলে অতিরিক্ত বৃষ্টি ফসল কাটা ব্যাহত করতে পারে। কফির ক্ষেত্রেও ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার রোবাস্তা উৎপাদন তাপ ও খরায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দুই দেশ মিলেই বিশ্বের রোবাস্তা কফির প্রায় অর্ধেক উৎপাদন করে। পশ্চিম আফ্রিকায় কোকোর উৎপাদনও ঝুঁকিতে৷ গত শক্তিশালী এল নিনোর সময় অতিবৃষ্টি, পরে তাপ ও শুষ্ক বাতাস ফলন কমিয়ে দাম রেকর্ড উচ্চতায় তুলেছিল।
সব ফসল অবশ্য একই ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণ ব্রাজিলের কিছু এলাকায় বেশি বৃষ্টি নির্দিষ্ট শস্যের ফলন বাড়াতেও পারে। বিশ্লেষকেরা তাই বলছেন, সব শস্যের দাম একসঙ্গে লাফিয়ে বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই; কোথায় ফসল হচ্ছে এবং কখন বৃষ্টি বা খরা হচ্ছে, তার উপর ফল নির্ভর করবে।
এর প্রভাব শুধু খাবারে থামবে না। অতিবৃষ্টিতে চিলির তামার খনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাম্বিয়ায় খরা হলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে খনিতে বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্টো দিকে কোনও কোনও অঞ্চলে শীত তুলনামূলক উষ্ণ হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা কমে কিছুটা স্বস্তিও মিলতে পারে।
বাণিজ্যের জন্য আর একটি বিপদের নাম পানামা খাল। ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোয় খরা এতটাই তীব্র হয়েছিল যে খালে জাহাজ চলাচলের দৈনিক সংখ্যা ৩৬ থেকে ২৪-এ নামাতে হয়েছিল। এ বারও জলাধারে পানি কমার আশঙ্কায় সেপ্টেম্বর থেকে চলাচল সীমিত করার পরিকল্পনা করছে খাল কর্তৃপক্ষ। জাহাজকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হলে সময় ও পরিবহণ ব্যয় দুটোই বাড়বে, যার শেষ অভিঘাত পড়বে পণ্যের দামে।
কিন্তু এল নিনোর সবচেয়ে ভয়াবহ হিসাবটি হয়তো তাৎক্ষণিক ক্ষতির নয়। ডার্টমাউথ কলেজের গবেষকেরা দেখেছেন, বড় এল নিনোর পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষত পাঁচ বছর কিংবা তারও বেশি সময় থেকে যেতে পারে। তাদের হিসাবে ১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনোয় পরবর্তী পাঁচ বছরে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, আর ১৯৯৭-৯৮ সালের ঘটনায় প্রায় ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালের এল নিনোই ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার পিছিয়ে দিতে পারে বলে তাঁদের মডেলের অনুমান। এই শতাব্দীতে এল নিনো-সংশ্লিষ্ট মোট ক্ষতি ৮৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলেও গবেষণায় পূর্বাভাস রয়েছে।
ক্ষতির ভারও সমান নয়। অতীতের বড় এল নিনোয় নিম্ন আয়ের উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ সালের ঘটনার কয়েক বছর পর পেরু ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের জিডিপি এমন পরিস্থিতির তুলনায় ১০ শতাংশেরও বেশি কম ছিল, যেখানে এল নিনো ঘটত না, ডার্টমাউথের গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে।
এই জায়গাটিই বাংলাদেশসহ খাদ্য আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য উদ্বেগের। চাল, ভুট্টা, সয়াবিন, চিনি কিংবা জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে তার প্রভাব আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতে পৌঁছতে সময় লাগে না। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা সরাসরি বাংলাদেশের আবহাওয়া ঠিক করে না দিলেও বিশ্ববাজারের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক ধাক্কা এ দেশেও পৌঁছতে পারে।
এল নিনো তাই আর শুধু আবহাওয়াবিদদের মানচিত্রের একটি রঙিন রেখা নয়। এক প্রান্তে বৃষ্টি না হলে অন্য প্রান্তে বাড়তে পারে চালের দাম; একটি নদীর জল কমলে হাজার কিলোমিটার দূরে বেড়ে যেতে পারে পণ্য পরিবহণের খরচ। প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া সেই উষ্ণ ঢেউ শেষ পর্যন্ত কতটা বড় অর্থনৈতিক সুনামি হয়ে উঠবে, আগামী কয়েক মাসে বিশ্ব এখন সেই হিসাবই কষছে।






