এবার নজর ট্রাম্পের আমেরিকায়
হাঙ্গেরি থেকে সার্বিয়া, শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের ঢেউ
- দুর্নীতির অভিযোগ আর জীবনযাত্রার ব্যয়ে ক্ষুব্ধ ভোটাররা, বিশ্বজুড়ে বদলাচ্ছে ক্ষমতার হিসাব
- হাঙ্গেরিতে অরবানের পতন, সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের জয়, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনেও দুর্নীতি বড় ইস্যু

ফ্রান্সের বিক্ষোভ
মানুষের পকেটে টান। অথচ ক্ষমতাবানদের সম্পদের পাহাড় ক্রমেই উঁচু হচ্ছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আর রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ঘিরে উঠছে দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত লাভের অভিযোগ। এই বৈপরীত্যেই যেন ফুঁসে উঠছে বিশ্বের নানা প্রান্ত। হাঙ্গেরিতে দীর্ঘ শাসনের অবসান। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর নির্বাচনী পালাবদল। এবার সেই অসন্তোষের ছায়া পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকায়। মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুর্নীতির প্রশ্ন কতটা প্রভাব ফেলছে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
সোমবার (২ নভেম্বর) মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে জনরোষ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার সংকট সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পেনসিলভানিয়ার বাসিন্দা নিকোল আরভিনের কথা। তিনবার ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন রাজনীতিকদের সম্পদ বৃদ্ধি আর সাধারণ মানুষের দুর্দশার ব্যবধান তাঁকে হতাশ করেছে।
একটি মুঠোফোনের চার্জার কিনতে দশ ডলার খরচ হয়েছে তার। আগে একই জিনিস কিনতেন অর্ধেক দামে। অথচ তার ধারণা, রাজনীতিকেরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। এবারের নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার কথাই ভাবছেন তিনি।
হাঙ্গেরিতে গত এপ্রিলে ১৬ বছরের শাসন হারিয়েছেন ভিক্টর অরবান। তার দল ফিদেসকে পরাজিত করে ক্ষমতায় এসেছে পিটার ম্যাগিয়ারের তিসা পার্টি। নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল বড় প্রশ্ন।
অরবানের সাবেক রাজনৈতিক পরিচালক বালাজ অরবান বলেছেন, অর্থনীতি ভালো থাকলে মানুষ ক্ষমতাবানদের সম্পদ নিয়ে আপত্তি কম করে। কিন্তু নিজেরা কষ্টে থাকলে নেতারাও সেই কষ্ট ভাগ করে নেবেন, এমন প্রত্যাশাই তৈরি হয়।
নতুন প্রধানমন্ত্রী ম্যাগিয়ারের বক্তব্য, দুর্নীতিতে হারিয়ে যাওয়া অর্থ জনগণের পেনশন ও শিশুদের কল্যাণে ব্যয় হওয়া উচিত।
একই ছবি সার্বিয়ায়। ২০২৪ সালে নোভি সাদের রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর পর শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। অভিযোগ ওঠে দুর্নীতি ও অবহেলার। প্রায় দুই বছরের আন্দোলনের পর গত ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে আলেক্সান্দার ভুচিচের দলকে হারিয়েছে শিক্ষার্থীসমর্থিত জোট।
ভুচিচ অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নির্বাচনী পরাজয় স্বীকার করলেও নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এখনও চলছে।
ব্রাজিলেও সম্প্রতি ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন লুলা ডি সিলভা। ভারত ও ইসরায়েলেও রাজনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে প্রতিবাদ ও বিতর্ক চলছে। তবে দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়।
এদিকে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জরিপে ৮৯ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, তাঁদের দেশে সরকারি দুর্নীতি ব্যাপক। দুই দশকের হিসাবে এটি সর্বোচ্চ।
অক্টোবরে ফক্স নিউজের জরিপেও দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ ছিল মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দামের চেয়ে বেশি। ৮৮ শতাংশ ভোটার বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত অথবা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।
ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্পের শাসনামলে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির সম্পর্ক গভীর হয়েছে। ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা ও ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন৷ টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকোর বক্তব্য, ‘দুর্নীতির সংকটের কারণেই আমাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট।’
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মার্কিন ভোটাররা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবেন। দুর্নীতি নিয়ে অসন্তোষ ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনও অজানা।
হাঙ্গেরি থেকে সার্বিয়া, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। মানুষের জীবনে অভাব বাড়লে ক্ষমতাবানদের বিলাসিতা কত দিন সহ্য করা যায়? আর যে জনতা একদিন নেতাকে ক্ষমতার শীর্ষে বসায়, তারাই যখন হিসাব চাইতে শুরু করে, তখন ক্ষমতার সিংহাসন কতটা নিরাপদ থাকে?



