ঝুলন্ত আসনেই ঝুলছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে বহুল অপেক্ষার সেই মধ্যবর্তী নির্বাচন। ব্যালট বাক্সে চলছে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাটদের ভোটযুদ্ধ। লড়াই শুধু কংগ্রেসের আধিপত্যের নয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের এক অগ্নিপরীক্ষা আজ। সাতটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ‘টস-আপ’ আসনের রুদ্ধশ্বাস ঘূর্ণাবর্তে ঝুলছে হোয়াইট হাউজের ক্ষমতার চাবিকাঠি। মিশিগান, টেক্সাস, ওহাইও, মেইন, আইওয়া, কানসাস ও আলাস্কা। এই ঝুলন্ত আসনগুলোর অদৃশ্য সুতায় এখন টানাপড়েন চলছে ট্রাম্পের শাসনভার ও নীতিমালার। আজকের এই প্রতিটি ব্যালটপেপার যেন একেকটি রায়— যা নির্ধারণ করবে মসনদের একক ক্ষমতা কি ট্রাম্পের দখলেই থাকবে, নাকি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে তার একক কর্তৃত্ব! বুথফেরত জরিপের জাদুতে আজ রাতেই গোটা দুনিয়া জেনে যাবে ট্রাম্পের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ!
নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে (সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ) ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে একচ্ছত্র ক্ষমতার রশিতে টান পড়বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য যেতে হবে ডেমোক্র্যাটদের কাছে। তাদের সমর্থন ছাড়া বিচারক নিয়োগ, সরকারি ব্যয় বরাদ্দ ও আইন প্রণয়ন কোনোটাই সম্ভব হবে না। মধ্যবর্তী নির্বাচন স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভারমন্ট স্টেটে ভোর ৫টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, ভার্জিনিয়া, কানেকটিকাট, কেনটাকি, মেইনসহ দেশের পূর্ব উপকূলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে সকাল ৬টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। এসব স্টেটে রাত ৯টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
সবচেয়ে বেশি ভোটারের স্টেট ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে নিউ ইয়র্কের চেয়ে তিন ঘণ্টা পরে। সে হিসাবে বাংলাদেশ সময় আজ সকালেও সেখানকার ভোটের লাইনে থাকবেন ভোটাররা। রাজ্যভেদে যুক্তরাষ্ট্রে ভোটগ্রহণ ও বন্ধের সময় ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে নর্থ ইস্টার্ন জোন এলাকায় রাত ৯টা নাগাদ ভোটগ্রহণ শেষ হয় এবং গণনা শেষে ফলাফল আসতে থাকে। এই নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। ১৫টি রাজ্যে নির্বাচনী সভা করেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ক্যাম্পেইন করেছেন। তারা দুজন একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য রেখেছেন। মাঠে মনে হচ্ছিল তারা দুজনই প্রার্থী। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করবে। শেষ হাসিটা কে হাসবেন? ট্রাম্প নাকি ওবামা।
মধ্যবর্তী এই নির্বাচনে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের ৩৫টি, নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের (হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস) ৪৩৫টি আসন ও ৩৬টি স্টেটের গভর্নর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন হচ্ছে না। চার বছর মেয়াদের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন হবে ২০২৮ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থায় দ্বিতীয় স্তম্ভ কংগ্রেস ও সরকারপ্রধান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। আইন প্রণয়ন, বিচারপতি নিয়োগ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয়ভার এই কংগ্রেসের অনুমোদনেই করতে হয়। একচ্ছত্র ক্ষমতার দাপটে হাত-পা বাঁধা পড়বে। জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন অনেক কঠিন হয়ে যাবে। বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তও করতে পারবে। সিনেট প্রেসিডেন্টের মনোনীত ফেডারেল বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য ও রাষ্ট্রদূতদের অনুমোদন দেয়। ফলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন। বর্তমান কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির একক আধিপত্য। সিনেটে ৫৩টি (মোট ১০০) ও প্রতিনিধি পরিষদে ২১৯টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
এই নির্বাচনে প্রায় ২০ কোটি ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এরই মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি আমেরিকান আগাম ভোট দিয়েছেন। যদিও এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হবে না। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় শিবিরেই উত্তেজনা। অধিকাংশ জরিপে ডেমোক্র্যাটদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ভেসে উঠছে। এর প্রধান কারণ ইরান যুদ্ধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। প্রতিনিধি পরিষদে তাদের বিজয় প্রায় নিশ্চিত। নিজেদের আসন ধরে রেখে রিপাবলিকানদের চারটি আসন ছিনিয়ে নিতে পারলেই প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের দখলে যাবে।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে সিনেট দখলে। ডেমোক্র্যাটদের এখন রয়েছে ৪৭টি আসন। সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে রিপাবলিকানদের চারটি আসনে জয়লাভ করতে হবে। অধিকাংশ জরিপে সাতটি আসনে এগিয়ে আছে তারা। আর এ আসনগুলো হচ্ছে টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলিনা, আইওয়া, ক্যানসাস, মেইন, আলাস্কা ও ওহাইও। এসবই রিপাবলিকানদের আসন। এর মধ্যে চারটিতে জিতলেই তারা পরিণত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে। তবে ডেমোক্র্যাটদের নিজস্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন জর্জিয়া ও মিশিগানে অবশ্যই জিততে হবে।
জরিপে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও গত ৩০ বছরে তারা সিনেট সিটে জয়ের স্বাদ পায়নি। তেমনি ৯৪ বছর ধরে ক্যানসাসে সিনেট সিট দখলে রেখেছে রিপাবলিকানরা। এবার জরিপে সেখানে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে। ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তার রেশ ধরে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেস দখলে নিলেও নিতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনে ‘নির্বাচনের মুখ’ হয়ে উঠেছেন মিশিগান থেকে সিনেট পদপ্রার্থী আবদুল আল সায়েদ। মুসলিম সায়েদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ ইসরায়েলি লবিস্ট গ্রুপ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। ট্রাম্প নিজেই সায়েদকে জেহাদিস্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, সায়েদ জিতলে ক্যাপিটল হিলে মেটাল ডিটেকটর বসানো হবে, যা কি না জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি ও গণতন্ত্রের ওপর বড় আঘাত। গত সোমবারের সর্বশেষ জরিপে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের চেয়ে দুই পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। সায়েদ জিতলে তিনিই আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হবেন। সারা দেশে আলোচনা হচ্ছে মিশিগানের আল সায়েদকে নিয়েই।



