পুরনো কাপড়ের কবর
- প্রতিবছর ৩৯ হাজার টন কাপড় ফেলা হয় চিলির আতাকামা মরুভূমিতে

সংগৃহীত ছবি
এতদিন আমরা শুনে এসেছি পুরনো গাড়ির কবরের কথা। এবার জানব পুরনো কাপড়ের কবর সম্মন্ধে। উত্তর চিলির আতাকামা মরুভূমি, যেখানে প্রতিবছর ফেলে দেওয়া হয় টন টন ব্যবহৃত পোশাক।
যুক্তরাজ্যেই হোক বা উত্তর আমেরিকায়—পুরনো কাপড় রিসাইক্লিং ব্যাংকে দেওয়া হলে বাস্তবে একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব পোশাকের উত্তর চিলির আতাকামা মরুভূমিতে জায়গা হওয়ার।
দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ ব্যবহৃত পোশাকের অন্যতম বড় আমদানিকারক। কিন্তু যেসব পোশাক আবার বিক্রি করা না যায়, সেগুলো বহু বছর জনমানবহীন, শুষ্ক প্রান্তরে বড় বড় স্তূপে দেওয়া হয়েছে ফেলে। একটি আইনি পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় এখন দেশটির একটি বেসরকারি কোম্পানি উদ্যোগ নিচ্ছে এই সমস্যার সমাধানে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর ১ লাখ ২৩ হাজার টন ব্যবহৃত পোশাক আমদানি করে চিলি। এর বড় মাধ্যম হলো দেশটির উত্তরে অবস্থিত মুক্তবাণিজ্য বন্দর ইকিকি। এই শহর এবং আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা শুল্ক বা ভ্যাট না দিয়েই করতে পারেন পণ্য আমদানি, সংরক্ষণ ও বিক্রি।
এলাকাটি পরিচিত জোফ্রি নামে, যার পূর্ণরূপ ‘জোনা ফ্রাঙ্কা ডেল ইকিকি (ইকিকি ফ্রি ট্রেড জোন)’। ১৯৭৫ সালে উত্তর চিলির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এটি।
সেখানে অন্যতম বড় আমদানি পণ্যে পরিণত হয় ব্যবহৃত পোশাক। এগুলো এখনও আনা হয় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ এবং এশিয়া থেকে জাহাজের কনটেইনারে বেল করে। পোশাকগুলো স্থানীয়ভাবে বিক্রি অথবা রপ্তানি করা হয় লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে।
জোফ্রির জেনারেল ম্যানেজার ফেলিপে গনসালেসের ভাষ্য, প্রায় ৫০টি পোশাক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সহায়তা করে স্থানীয় অর্থনীতিতে। তিনি আরও যোগ করেন, এটি এমন একটি খাত, যা তৈরি করে এই অঞ্চলের স্থানীয় নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান। প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ কাজ করে টেক্সটাইলের সঙ্গে।
গনসালেস জানান, নারীরা সাহায্য করে পোশাকগুলোর মান অনুযায়ী সেগুলো বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করতে। এটি খুব উচ্চ দক্ষতার কাজ নয়, ফলে কম যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের জন্যও এটি সহজলভ্য।
সবচেয়ে নিম্নমানের পোশাকগুলো শেষ পর্যন্ত লা কেব্রাডিল্লা নামের একটি বিশাল খোলাবাজারে নেওয়া হয়। বাজারটি অবস্থিত আল্টো হসপিসিও শহরের কাছে। ইকিকি থেকে প্রায় আধা ঘণ্টার পথ দূরে এবং বাজারটি এখনও জোফ্রির আওতাধীন।
সেখানে দেখা যায়, সারি সারি তাঁবুর নিচে প্লাস্টিকের চাদরের ওপর স্তূপ করে রাখা অসংখ্য কাপড়।
স্টলধারীরা বিক্রি করেন টি-শার্ট, জিন্স থেকে শুরু করে- সবকিছুই। দাম খুবই সস্তা, ৫০০ চিলিয়ান পেসো (৫৪ সেন্ট; ৪২ পেন্স) থেকে শুরু। সস্তায় কাপড় কিনতে পর্যটক ও স্থানীয়রা এখানে ভিড় করেন, বিশেষ করে সপ্তাহান্তে।
যদিও এই কাপড় স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তবু বড় সমস্যা হলো যেসব পণ্য বিক্রি হয় না সেগুলোর কী হয়। এগুলো ফেলা যায় না স্থানীয় কাউন্সিলের ময়লার ভাগাড়ে। কারণ সেটি শুধু গৃহস্থালির বর্জ্যের জন্য, বাণিজ্যিক আমদানির জন্য নয়।
তাই ব্যবসায়ীদের উচিত- হয় বাতিল কাপড় রপ্তানি করা বা মুক্তবাণিজ্য এলাকার বাইরে বিক্রির জন্য কর পরিশোধ করা; অথবা অনুমোদিত কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোম্পানিতে পাঠানো।
এসব বিকল্পের জন্য ব্যয় করতে হয় অর্থ। তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে কাপড় পোড়ায় অথবা ফেলে দেয় পাশের আতাকামা মরুভূমিতে। প্রতি বছর প্রায় ৩৯ হাজার টন কাপড় অবৈধভাবে ফেলা হয় সেখানে।
এটি আল্টো হসপিসিও শহর প্রশাসনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। শহরের পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত মিগেল পাইনেনাহুয়েলের মতে, এই অবৈধ কার্যক্রম নজরদারি করা ও থামানো কঠিন।
আল্টো হসপিসিও শহর মরুভূমি ও পাহাড়ে ঘেরা। ফলে আতকামায় ট্রাক বা লরি দিয়ে সহজেই গিয়ে কাপড় ফেলে আসা যায়। শহর কাউন্সিলের গাড়ি ও ক্যামেরাসহ টহল দল রয়েছে, যাতে কী হচ্ছে তা নজরে রাখা যায় এবং দোষীদের করা যায় জরিমানা।
তবে মিগেল স্বীকার করেন, এত বেশি ট্রাক বাতিল কাপড় ফেলছে যে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সত্যিই কঠিন!
এদিকে, একটি সমাধান এসেছে যেখানে বর্জ্য কাপড়কে পরিণত করা হচ্ছে ব্যবসায়িক সুযোগে।
সেন্ট্রো টেকনোলজিকো দে ইকোনমিয়া সার্কুলারের (সার্কুলারটেক) নির্বাহী পরিচালক লুইস মার্টিনেজ। কোম্পানিটি একটি বেসরকারি চিলিয়ান সংস্থা, যা সম্পদ ফেলে না দিয়ে কাজ করে পুনর্ব্যবহারের প্রচারে। মার্টিনেজ সম্প্রতি নেতৃত্ব দেন একটি প্রকল্পের, যেখানে বিক্রি না হওয়া পুরনো কাপড় কীভাবে পুনর্গঠন ও পুনর্ব্যবহার করা যায়, তা দেখা হয় খতিয়ে।
মার্টিনেজের ভাষ্য, আমরা চাই না আতাকামা মরুভূমি এমন একটি পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত হোক, যেখানে দর্শনার্থীরা দেখতে পায় কাপড়ের পাহাড়।
মার্টিনেজ এমন একটি কারখানার কথা উল্লেখ করেন, যা তৈরি করা হচ্ছে অবাঞ্ছিত কাপড়ের নতুন ব্যবহার খুঁজে বের করার জন্য। কারখানাটি বাতিল মজুদ কাপড়ের বড় একটি অংশ সামাল দিতে পারবে, যোগ করেন তিনি।
আল্টো হসপিসিও শহর থেকে প্রায় ২০ মিনিটের দূরত্বে গরম ও বাতাসপূর্ণ মরুভূমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে ওই স্থাপনাটি। কারখানাটিতে প্রয়োজন হবে না পানি বা রাসায়নিকের।
কারখানাটির মালিক তুরস্কের নাগরিক বাকির কনকারের ভাষ্য, ‘আমরা এমন মেশিন ব্যবহার করব যা বাতিল পোশাকগুলোকে রূপান্তর করবে তন্তুতে। তারপর তা পরিণত হবে ফেল্টে (এক ধরনের বস্ত্র)। এটি ব্যবহার করা হবে ম্যাট্রেস, আসবাবপত্র, গাড়ির ভেতরের অংশে এবং ইনসুলেশনের মতো জিনিসে।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি







