সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা, দ্রুত বাড়ছে তাপ

শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কায় বিশ্ব/প্রতীকী ছবি
২০২৬ সালের শেষ দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকায় তৈরি হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির আশঙ্কা।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছরের শেষ দিকে এল নিনো এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে তা এ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর একটি, এমনকি হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাও।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাসহ (ডব্লিউএমও) বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, শক্তিশালী পর্যায়ে প্রবেশের পথে রয়েছে চলমান এল নিনো চক্র। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এর তীব্রতা পৌঁছাতে পারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
জলসম্পদবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের পরিচালক অনুষ্মান বলেন, ২০২৬ সালের শেষ দিকে একটি অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে বর্তমান পূর্বাভাস। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের সর্বশেষ মূল্যায়নে উত্তর গোলার্ধের শরৎ ও শীত মৌসুমে খুব শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি। একই পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের এল নিনো অতীতে নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৬৯ শতাংশ।
অনুষ্মান জানান, প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য উষ্ণতা। সমুদ্রের উপরিভাগের নিচেও জমা হয়েছে বিপুল পরিমাণ তাপ। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালনেও দেখা যাচ্ছে শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবর্তন।
তিনি আরও বলেন, ‘নভেম্বর ও ডিসেম্বর এল নিনোর সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময়। কারণ, সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল নিনোর তীব্রতা পৌঁছায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বর্তমান পূর্বাভাস একটি অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিলেও এর সঠিক তীব্রতা জানা যাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় এগিয়ে আসার পর।’
এল নিনোর দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠার বিষয়টি তুলে ধরেছেন আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠান স্কাইমেট ওয়েদারের আবহাওয়াবিদ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের সভাপতি জি পি শর্মাও। তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে এভাবে অস্বাভাবিক দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি একটি শক্তিশালী সংকেত। এর ফলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালের শীতে এল নিনো নথিভুক্ত ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি, এমনকি হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাও। এখনো বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে এল নিনো। ২০২৬ সালের অক্টোবরের পর এর তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ২০২৭ সালের বসন্তের শুরু পর্যন্ত এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৬ সালের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের শেষ দিকে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে, স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির ঝুঁকি বেড়েছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে রয়েছে ঝড়ের তৎপরতা বাড়ার সম্ভাবনাও। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের ওপর মৌসুমি বায়ুর প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে।’
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এল নিনোর দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে উদ্বেগ। জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসে দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে বিশ্বকে এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, ‘এল নিনো শুধু আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে না, এটি ঘরের ভেতরে ঢুকে তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এটি কেবল শুরু। এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে। এর ফলে পৃথিবী আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ, ভয়াবহ দাবানল এবং রেকর্ড উষ্ণ সমুদ্র।’
আগাম সতর্কবার্তার ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলোও। তিনি বলেন, ‘নজিরবিহীন সমুদ্রের উষ্ণতা ও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার প্রেক্ষাপটে এল নিনোর এই বিকাশ সরকার ও জনগোষ্ঠীগুলোকে ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা নেওয়া এবং এর প্রভাব শুরু হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, আগামীকাল তার প্রভাব আমরা কীভাবে অনুভব করব, তা অনেকাংশে সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।’
স্কাইমেট ওয়েদারের গবেষণা ও উপাত্ত অনুযায়ী, এল নিনো শক্তিশালী পর্যায়ে প্রবেশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে আগস্টেই। এর ফলে শীতকালে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর আগে কয়েক মাস ধরে সমুদ্রের সঞ্চিত তাপ বায়ুমণ্ডলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে।
এল নিনো চরম মাত্রায় পৌঁছালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল, মধ্য আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল এবং উত্তর ইউরোপে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে আফ্রিকার বৃহত্তর হর্ন অঞ্চল, উত্তর আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ায় অতিবৃষ্টি, ঝড় ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় শুধু পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে চলবে না। সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কয়েক মাস আগেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।








