চাকরি থেকে এআই–তরুণদের সামনে নতুন দরজা
পাকিস্তানে অফিস খুলল গুগল

ছবি: রয়টার্স
সার্চ ইঞ্জিন থেকে ইউটিউব, অ্যান্ড্রয়েড থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–পাকিস্তানে বহু বছর ধরেই কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ গুগল। কিন্তু দেশটিতে এত দিন ছিল না প্রযুক্তি জায়ান্টটির নিজস্ব স্থানীয় অফিস। সেই ছবিই বদলে গেল। গত ১৮ আগস্ট ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রথম স্থানীয় দপ্তর চালু করেছে গুগল। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে উদ্বোধনের পর সংস্থাটি জানিয়েছে, এ বার শুধু অনলাইনে পরিষেবা নয়, তরুণদের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্থানীয় ব্যবসাকে বিশ্ববাজারে নেওয়া এবং পাকিস্তানে তৈরি ক্রোমবুক রফতানির দিকেও আরও জোর দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গুগলের সরকারি সম্পর্ক ও জননীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট উইলসন হোয়াইটের নেতৃত্বে নয় সদস্যের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিল। সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নাটালি বেকার। শাহবাজ, হোয়াইট ও অন্য অতিথিরা যৌথ ভাবে স্মারক ফলক উন্মোচন করে অফিসটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। গুগল ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে নিবন্ধিত হয়েছিল; প্রায় চার বছর পর মিলল নিজস্ব স্থানীয় ঠিকানা।
শাহবাজ এই পদক্ষেপকে পাকিস্তানের ‘ডিজিটাল রূপান্তরের বড় মাইলফলক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য, সরকারি পরিষেবা থেকে অর্থনীতি–সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে চাইছে ইসলামাবাদ। সরকারের ‘ডিজিটাল নেশন পাকিস্তান’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গুগলের মতো একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সরাসরি উপস্থিতি সেই কাজকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে বলে আশা তার।
গুগলের উইলসন হোয়াইটও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সংস্থাটির সম্পর্ক এক দশকেরও বেশি পুরনো। নতুন অফিস সেই সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে পাকিস্তানি তরুণদের জন্য দক্ষতা তৈরির সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছতে সহায়তা করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। পাকিস্তানকে বছরে ৩ হাজার কোটি ডলারের তথ্যপ্রযুক্তি রফতানিকারক অর্থনীতিতে পরিণত করার যে লক্ষ্য শাহবাজ সরকার নিয়েছে, তার সঙ্গেও গুগলের পরিকল্পনার মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রশিক্ষণ থেকে ক্রোমবুক
গুগলের পাকিস্তান পরিকল্পনার বড় অংশ জুড়েই রয়েছে তরুণ প্রজন্ম। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে পাকিস্তানে ৩ লাখ ৫০ হাজার গুগল ক্যারিয়ার সার্টিফিকেট বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষ করা ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশের বেশি ছয় মাসের মধ্যে নতুন চাকরি পাওয়া কিংবা নিজেদের ব্যবসায় উন্নতির কথা জানিয়েছেন বলে দাবি গুগলের। গুগল ডেভেলপার গ্রুপের মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ ডেভেলপারের কাছে পৌঁছেছে সংস্থাটি; ‘এআই সিখো’ কর্মসূচিতে জেনারেটিভ এআই ও গুগল ক্লাউড প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার ডেভেলপার।
অনলাইন নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে আলাদা উদ্যোগ। ‘ডিজিটাল সফর’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিন লাখের বেশি শিক্ষার্থী ও প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষককে ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও অনলাইন নিরাপত্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে গুগল। সব কর্মসূচি মিলিয়ে পাকিস্তানের ১০ লাখের বেশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ডেভেলপার ও কনটেন্ট নির্মাতাকে ডিজিটাল দক্ষতার আওতায় আনার দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আর একটি বড় পরিকল্পনা হার্ডওয়্যার উৎপাদনে। গুগল, টেক ভ্যালি, অ্যালায়েড এবং পাকিস্তানের ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন করপোরেশনের অংশীদারত্বে হারিপুরে ইতিমধ্যেই ক্রোমবুক সংযোজন লাইন চালু হয়েছে। বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ক্রোমবুক তৈরির সক্ষমতা রাখা হয়েছে সেখানে। পাকিস্তানের শিক্ষা খাতে ব্যবহারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ‘মেড ইন পাকিস্তান’ ক্রোমবুক প্রতিবেশী দেশগুলোতেও রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন হোয়াইট।
গুগলের পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের ক্লাস্টার পরিচালক ফারহান কুরেশির বক্তব্য, পাকিস্তানের ‘ডিজিটাল ভবিষ্যৎ ও মানুষের প্রতিভায়’ বিশ্বাস করেই স্থানীয় অফিস খোলা হয়েছে। নতুন দপ্তরের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসা, স্টার্টআপ, গেমিং ও অ্যাপ নির্মাতাদের আরও সরাসরি সহায়তা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। গুগলের দাবি, গত এক দশকে তাদের পণ্য ও বিভিন্ন কর্মসূচি পাকিস্তানের ব্যবসা ও পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রায় ৩ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন পাকিস্তানি রুপির সুবিধা তৈরি করেছে এবং ৯ লাখ ৬০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানকে সহায়তা করেছে। এটি অবশ্য গুগলের নিজস্ব হিসাব।
সময়টিও পাকিস্তানের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি রফতানি রেকর্ড ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ২১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েই রফতানি হয়েছে ৪১৭ মিলিয়ন ডলারের তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, যা এক বছর আগের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।
তবে ইসলামাবাদে অফিস খোলা মানেই যে পাকিস্তানে এখনই গুগলের বড় সফটওয়্যার প্রকৌশল বা গবেষণা কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, এমন কোনও ঘোষণা এখনও আসেনি। আপাতত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সরকারি ও শিল্পখাতের অংশীদারত্ব, দক্ষতা উন্নয়ন, এআই, স্থানীয় ব্যবসা এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদনে।
তবু পাকিস্তানের প্রযুক্তি খাতের কাছে ঘটনাটির প্রতীকী গুরুত্ব কম নয়। যে গুগল এত দিন দেশটিতে মূলত ডিজিটাল পরিষেবা ও অংশীদারদের মাধ্যমেই উপস্থিত ছিল, এ বার তাদের নামফলকও উঠল ইসলামাবাদে। এখন পরীক্ষা, সেই নামফলক থেকে কতটা নতুন চাকরি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ আর আন্তর্জাতিক বাজারের দরজা খুলতে পারে পাকিস্তানের তরুণদের জন্য।






