মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফিরল যে জীবন

ভোটেকোশী, নারায়ণী, ত্রিশূলির চেনা ঢেউগুলো হঠাৎ অচেনা! জল-যমের তাণ্ডব নৃত্যে ভাঙছে দুইপাড়ের বসতি। খড়কুটোর মতো ভাসছে মানুষ! বাতাসে বুক চেরা আর্তনাদ। বেঁচে থাকার শেষ চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো জনপদ। ঠিক সেই প্রলয়-মুহূর্তেও জীবনের শেষ দুয়ারে দাঁড়িয়েও যারা মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে ছিনিয়ে এনেছে নিজ নিজ নিশ্বাস, তাদের গল্প কোনো সাধারণ বেঁচে থাকা নয়— এ এক অলৌকিক পুনর্জন্ম, যা শতাব্দীর বুকে খোদাই করে গেল নেপালের অপরাজেয় জীবনের মহিমা।
পাহাড় কাঁপিয়ে বুধবার হঠাৎ নেমে এসেছিল ভোটেকোশীর ভয়ংকর ঢল। কেউ দৌড়ে, কেউ গাড়ি ছুটিয়ে, কেউ বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন; আবার কারও বেঁচে যাওয়া ছিল নিছক ভাগ্যের খেলা। চোখের সামনে ঘরবাড়ি, জনবসতি আর প্রিয়জনদের স্রোতে ভেসে যেতে দেখেও যারা বেঁচে আছেন, তাদের মুখে এখন শুধু একটাই কথা— ‘মনে হচ্ছে, নতুন জীবন পেয়েছি।’
‘বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরে বেঁচে গেছি’: কাদায় মাখামাখি শরীর। খালি পায়ে কর্দমাক্ত সড়ক ধরে হাঁটছেন এক তরুণ। প্রতিটি পা ফেলতেই যেন তাকে লড়াই করতে হচ্ছে।
রাউতহাটের রাজদেবী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজমিনিয়ার ৩৬ বছর বয়সী রামবচন সাহের এই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ত্রিশূলি বাজারের বন্যা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর ছবিটি প্রকাশ্যে আসে।
সাহ ১৫ বছর ধরে সেতুর কাছে শ্যাম মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন। বুধবার সকালে তিনি মিষ্টি তৈরি করছিলেন। হঠাৎ বন্যার পানি দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে তার হাত একটি বিদ্যুতের তারে আটকে যায়। তিনি বললেন, ‘তারটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে গেছি। যেন নতুন জীবন পেয়েছি।’ প্রায় আধা ঘণ্টা তিনি তারটি ধরে ঝুলে ছিলেন। নিচে তখন গর্জন করে ছুটছিল বন্যার পানি।
তার ভাষ্য, ‘নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় না দেখে কাছে ঝুলে থাকা একটি বিদ্যুতের তার ধরে ফেলি। প্রায় আধা ঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলে থেকে বাঁচার জন্য লড়াই করেছি। আমার হাত যদি তার থেকে পিছলে যেত, তাহলে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগই ছিল না।’
তারটি তাকে ধরে রেখেছিল। সাহ বেঁচে গেছেন। তবে দোকানের তিনজন— সংগীতা, তার ছেলে রাহুল এবং আরেক
কর্মী বিনোদ ভগত— এখনো নিখোঁজ। সাহ এখন এক বন্ধুর বাড়িতে আছেন। তিনি বললেন, ‘আমার শরীরে হয়তো এখনো বন্যার কাদার দাগ লেগে আছে। কিন্তু সেদিন সকালের সেই ভয় এখনো আমার মনে একেবারে তাজা।’
‘আমি সামনে ছিলাম, আর ঠিক পেছনেই ছিল বন্যা’: মাকওয়ানপুরের থাহা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ফেদিগাঁওয়ের রাজ কুমার কার্কি বন্যার আগে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন।
তিনি মঙ্গলবার নুওয়াকোটের বেত্রাবতীতে পৌঁছেছিলেন। পরদিন সকালে পণ্যবোঝাই করতে টিমুরের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় মাইকে সতর্কবার্তা শুনতে পান— ‘বন্যা আসছে, বন্যা আসছে।’
কার্কি তার কনটেইনার ট্রাক ঘুরিয়ে গালছির দিকে চালাতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বন্যার পানির বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসতে দেখেন এবং গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন।
কার্কি বললেন, ‘পেছনে বন্যা, আর আমি সামনে— উন্মত্ত ভোটেকোশী নদীর স্রোতের আগে ছুটে প্রাণে বেঁচেছি। পালানোর জন্য যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি চালিয়েছি। আমার পেছনে থাকা প্রায় ৯টি কনটেইনার ট্রাক ও তাদের চালক এরই মধ্যে ভেসে গিয়েছিল।’
পাশের আয়নায় নিজের দিকে ধেয়ে আসা বন্যার স্রোত দেখেও কার্কি গাড়ি চালিয়ে যেতে থাকেন। ত্রিশূলির ধুঙ্গে বাজারে পৌঁছানোর আগে তিনি ট্রাকটি পাহাড়ের দিকে তুলে দেন।







