উগান্ডায় শিম্পাঞ্জিদের গৃহযুদ্ধ, শেষ হবে কবে?

২০১৯ সালে পশ্চিম দলের পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা বেসিকে আক্রমণ করে। ছবিতে মাঝখানে থাকা বেসি তখন ভয় বা ব্যথার কারণে মুখ বিকৃত করে ছিল, এবং সে সেন্ট্রাল দলের অংশ ছিল।
উগান্ডার কিবালে ন্যাশনাল পার্কের গহীন জঙ্গলে এক সময় শিম্পাঞ্জিরা রাজত্ব করত মিলেমিশে। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে গেছে সেই চেনা দৃশ্য। বিশ বছর ধরে একসাথে থাকা শিম্পাঞ্জিরা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে একে অপরের জানের দুশমন। গবেষক অ্যারন স্যান্ডেল ২০১৫ সালের এক দুপুরে প্রথম লক্ষ্য করেন যে, শিম্পাঞ্জিরা একে অপরকে দেখে খুশিতে চিৎকার করার বদলে দৌড়ে পালাচ্ছে ভয়ে। সেই দিন থেকেই শুরু হয় শিম্পাঞ্জিদের এই ঐতিহাসিক বিভাজন।
গবেষকদের মতে, এক সময়ের বিশাল এই শিম্পাঞ্জি দল এখন ভাগ হয়ে গেছে ‘ওয়েস্টার্ন’ এবং ‘সেন্ট্রাল’ এই দুই গ্রুপে। এদের মধ্যকার এই শত্রুতা এখন এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গবেষকরা একে রীতিমতো ডাকছেন ‘গৃহযুদ্ধ’ বলে। প্রতি ৫০০ বছরে এমন ঘটনা একবার ঘটে বলে তারা মনে করছেন। আগে এই শিম্পাঞ্জিরা পুরো জঙ্গল চষে বেড়াত, কিন্তু এখন তারা বর্ডারে পাহারা দেয় যাতে অন্য গ্রুপের কেউ ঢুকতে না পারে তাদের এলাকায়।
এই গৃহযুদ্ধে অনেক বেশি রাগী আর হিংস্র হয়ে উঠেছে ‘ওয়েস্টার্ন’ গ্রুপের শিম্পাঞ্জিরা। তারা সুযোগ পেলেই অতর্কিত হামলা চালায় ‘সেন্ট্রাল’ গ্রুপের ওপর। ২০১৮ সালে ‘এরল’ নামে এক তরুণ শিম্পাঞ্জিকে পাঁচটি শক্তিশালী পুরুষ শিম্পাঞ্জি মেরে ফেলে মিলে নির্মমভাবে। এরপর ২০১৯ সালে তারা কোণঠাসা করে হত্যা করে ‘বেসি’ নামের এক প্রবীণ সদস্যকে। বেসিকে বাঁচাতে এক নারী শিম্পাঞ্জি এগিয়ে এলে তাকেও তাড়িয়ে দেয় খুনিরা।
এই নিষ্ঠুর যুদ্ধের সবথেকে ভয়াবহ দিক হলো ছোট ছোট বাচ্চাদের হত্যা করা। এখন পর্যন্ত এই দ্বন্দ্বে ৭টি পূর্ণবয়স্ক এবং ১৭টি শিশু শিম্পাঞ্জি প্রাণ হারিয়েছে। আরও ১৪টি শিম্পাঞ্জি নিখোঁজ রয়েছে, যাদের কপালে সম্ভবত মৃত্যু জুটেছে। গবেষক স্যান্ডেল দুঃখ করে বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে নিজেকে যুদ্ধের সংবাদদাতার মতো মনে হয়, কারণ চোখের সামনে নিজের পরিচিত শিম্পাঞ্জিদের এভাবে মরে যেতে দেখা খুবই যন্ত্রণাদায়ক।’
ঠিক কী কারণে বন্ধু শিম্পাঞ্জিরা এমন শত্রু হয়ে উঠল, তা নিয়ে কয়েকটি ধারণা আছে। গবেষকরা মনে করেন, ২০১৪ সালে কিছু শিম্পাঞ্জির মৃত্যু আর ২০১৫ সালে নেতা বদলে যাওয়ার পর থেকেই তাদের মধ্যে ধরে ফাটল। এছাড়া ২০১৭ সালের এক মহামারি রোগ তছনছ করে দেয় তাদের মধ্যকার পুরোনো বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলো। আসলে এক দলে সদস্য সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় তারা আর আগের মতো একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।
বিজ্ঞানীদের মতে, শিম্পাঞ্জিদের এই যুদ্ধ থেকে মানুষের সংঘাত সম্পর্কেও অনেক কিছু জানা যায়। মানুষের যেমন ধর্ম বা গোত্র নিয়ে যুদ্ধ হয়, শিম্পাঞ্জিদের তেমন কিছু নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সম্পর্কের টানাপোড়েন যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই গৃহযুদ্ধ। এই লড়াইয়ের মাধ্যমে গবেষকরা বুঝতে পারছেন শিম্পাঞ্জিদের বীরত্ব, বন্ধুত্ব আর সহমর্মিতার পাশাপাশি তাদের মনের হিংস্র দিকগুলোও।
এই যুদ্ধের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে স্যান্ডেল দুটি ভবিষদ্বাণী করেছেন। প্রথমত, সেন্ট্রাল গ্রুপ হয়তো নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে এলাকা রক্ষা করবে, যাতে মৃত্যু কমে আসে। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী ওয়েস্টার্ন গ্রুপ হয়তো দুর্বল সেন্ট্রাল গ্রুপের সব সদস্যকে একে একে মেরে ফেলে তাদের বংশ নির্বংশ করে দেবে। যদিও তারা আবার মিলেমিশে যাবে এমন একটা ক্ষীণ আশা আছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন



