এল সালভাদরে বিচারের মুখোমুখি কুখ্যাত গ্যাংয়ের ৫০০ সদস্য

২০ এপ্রিল মধ্য আমেরিকার শক্তিশালী গ্যাং মারা সালভাত্রুচা (এমএস-১৩) এর প্রায় ৪৯০ জন কথিত সদস্য, যাদের মধ্যে শীর্ষ নেতারাও রয়েছে, এল সালভাদরে একযোগে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে বলে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও আদালত জানিয়েছে।
এল সালভাদরের আদালত পাড়ায় এখন চলছে এলাহি কাণ্ড। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে কুখ্যাত গ্যাং এমএস-১৩ এর ৪৮৬ জন সদস্যের এক বিশাল গণবিচার। দেশটির প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে গ্যাংস্টারদের শায়েস্তা করতে যে বিশেষ ক্ষমতা হাতে নিয়েছেন, তার অধীনেই আয়োজন করা হয়েছে এই বিশাল বিচারের। আদালতের এজলাসে এত অপরাধী একসাথে দেখে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছেন সবাই।
সরকারি আইনজীবীরা আদালতে জানিয়েছেন, এই গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তাদের হাতে ঝরেছে হাজারো মানুষের প্রাণ। এমনকি একটি নির্দিষ্ট ছুটির দিনে তারা এত মানুষকে খুন করেছিল যে, এল সালভাদরের গৃহযুদ্ধের পর দেশটিতে এমন রক্তগঙ্গা আর কখনো দেখা যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে খুনাখুনি ছাড়াও চাঁদাবাজি আর অস্ত্র ব্যবসার মতো গুরুতর সব অভিযোগ।
২০২২ সালে দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পর থেকে এখন পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেছে প্রায় ৯১ হাজার ৫০০ মানুষকে। এই বিশাল সংখ্যক আসামির বিচার করতে দেশটির সংসদ একটি বিশেষ আইন পাস করেছে, যার ফলে এখন একসাথেই করা সম্ভব হচ্ছে শত শত আসামির বিচার। এই গণবিচারকে দেখা হচ্ছে বুকেলে সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে।
তবে এই গণবিচার নিয়ে মোটেও খুশি নয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছে যে, একসাথে এত মানুষের বিচার করলে কেউ পাবে না ন্যায়বিচার। এমনকি আসামিরা তাদের পছন্দের উকিলের সাথে কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছে না। ‘ইন্টার-আমেরিকান কমিশন অন হিউম্যান রাইটস’ সাফ জানিয়েছে যে, অপরাধ দমনের নামে এভাবে জরুরি অবস্থা চালিয়ে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না।
এই মামলার আসামিদের রাখা হয়েছে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন কারাগারে কড়া পাহারায়। এর মধ্যে ‘সেকট’ নামের একটি হাই-সিকিউরিটি জেল এখন পুরো বিশ্বের আলোচনার বিষয়। ২০২৩ সালে চালু হওয়া এই জেলটি মূলত গ্যাংস্টারদের জন্য এক সাক্ষাৎ যমপুরী। প্রেসিডেন্ট বুকেলে বারবার বলছেন যে, অপরাধীদের সাথে কোনো ধরণের আপস করা হবে না।
প্রসিকিউটররা আদালতে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে শুরু করে গুলির ফরেনসিক রিপোর্ট সব ধরণের প্রমাণ হাজির করেছেন। তারা বিচারকের কাছে দাবি করেছেন যেন প্রতিটি আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়। আইন অনুযায়ী, কোনো একজন আসামি যদি অনেকগুলো অপরাধে দোষী প্রমাণিত হন, তবে তার জেল হতে পারে ২৪৫ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ পুরো জীবনটাই তাকে জেলের ঘানি টেনে কাটাতে হবে।
যাদের বিচার চলছে, তাদের মধ্যে গ্যাংয়ের অনেক পুরনো আর বড় বড় সব পান্ডা রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সরকারের সাথে যখন গ্যাংগুলোর একটা আপস হয়েছিল, তখন এই নেতারাই তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট বুকেলে সেই পুরনো সমঝোতা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে তাদের এখন লোহার খাঁচায় পুরছেন।
প্রেসিডেন্ট বুকেলের এই কঠোর অ্যাকশনের ফলে দেশটিতে খুনের হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। সরকারি হিসাব বলছে, ২০২২ সালে যেখানে প্রতি লাখে খুনের হার ছিল প্রায় ৮ জন, গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ জনে। সাধারণ মানুষ এই শান্তিতে খুশি হলেও বিদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো প্রশ্ন তুলছে।

