তেলাপোকা বসন্তের হাওয়া ভারতে
- ৬ জুন ভারতে ফিরছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা
- শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিল্লিতে

‘তেলাপোকা বসন্তে’র হাওয়া উঠেছে ভারতে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের আন্দোলন ঘাড়ে নিয়ে দেশে ফিরছেন ‘ককরোচ (তেলাপোকা) জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে (৩০)। ৬ জুনের সকালে দিল্লির মাটি ছুঁতেই শুরু হবে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ। বিমানবন্দর থেকে হেঁটে হেঁটে যন্তর মন্তর ময়দানে গিয়ে বসবে তার তেলাপোকার দল (জেন-জি অনুসারীরা)। গতকাল সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামের অ্যাকাউন্টে নিজেই সে ঘোষণা দিয়েছেন অভিজিৎ।
আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে ঠিক এই পথেই গুটি গুটি পায়ে আরব বসন্তের ঝড় উঠেছিল আরব বিশ্বের দেশগুলোয়। তছনছ হয়ে গিয়েছিল তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া, জর্ডান, মরক্কো, ইয়েমেনের শাসকগোষ্ঠীর সাজানো বাগান। আঁচ লেগেছিল ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদানের সরকার যন্ত্রেও। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আছড়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের জ্বালামুখেই কি পড়তে চলেছে ভারতের মোদি সরকার? ২০১৪ সালের ২৬ মে থেকে ভারতের গদিতে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) টার্গেট করেই মূলত তেলাপোকা পার্টি সিজেপির ব্যঙ্গাত্মক আদল দেন অভিজিৎ। ১৬ মে আত্মপ্রকাশের পাঁচ দিনের মাথায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফলোয়ার কোঠায় ছাড়িয়ে যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় দল বিজেপিকে! ঠিক ১৬ দিনের মাথায় এই দলের মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা কার্যত তেলাপোকার শক্তি পরীক্ষার আভাস। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলনের সূচনাও বটে।
সোমবার একটি ভিডিওবার্তায় সমর্থক ও ছাত্রদের আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা ৬ জুন বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকেন এবং সেখান থেকেই একসঙ্গে আন্দোলনের পথে এগোন। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠরত অভিজিতের অবিযোগ, দেশের বিভিন্ন পরীক্ষায় বারবার বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম দেখা যাচ্ছে কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বলেছেন, ‘সময় এসেছে সবার একত্রিত হওয়ার, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংবিধানের পথে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে শামিল হওয়ার সময় আগত। আগামী ৬ জুন (শনিবার) আমি দিল্লি পৌঁছাব। বিমানবন্দরেই আমরা একত্র হয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিট পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে যন্তর মন্তরে ধর্না, বিক্ষোভের অনুমতি চাইব।’ পরপর নিটসহ একাধিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, এর ফলে পড়ুয়ারা উদ্বিগ্ন হচ্ছেন এবং সরকারকে এর দায়ভার গ্রহণ করতে হবে। ছাত্রসমাজের চালু করা সামাজিক মাধ্যমের এই প্ল্যাটফর্ম এখনো পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন মানুষের সমর্থন পেয়েছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ছাত্রসমাজের নানা সমস্যা তুলে ধরতে শুরু করেছে ককরোচ জনতা পার্টি।
তেলাপোকার এই আন্দোলনকে ঘিরে এরই মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিরোধীরা দাবি তুলেছেন। ককরোচ বা তেলাপোকা পার্টিও। সিজেপির দাবিতে আট লাখ মানুষ সম্মতি দিয়েছেন, তা সত্ত্বেও শিক্ষামন্ত্রী দায় গ্রহণ করেননি। ককরোচ বা তেলাপোকারা তাই ঠিক করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে বেরিয়ে পথে নেমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শামিল হবেন। সংগঠনটি যেহেতু অনলাইনভিত্তিক, তাই এর প্রচার ও সমর্থন মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই বেশি।
অভিজিৎ আরও বলেছেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে বহু শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। লাখ লাখ ছাত্রের পরিশ্রম বৃথা। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সই করেছেন আট লাখ ককরোচ বা তেলাপোকা। কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের দাবি সমর্থনও করেছেন। মহারাষ্ট্র, লখনৌ, জয়পুরসহ বহু স্থানে মানুষ বিক্ষোভও দেখাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘মানুষ প্রতিবাদে সরব থাকলেও সরকার নির্বিকার। বিভিন্ন পরীক্ষার এক কোটি ছাত্রছাত্রীর জীবন আজ কৌতুকে পরিণত। শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কাউকে এর দায় নিতে হবে।’
ককরোচের এ সামাজিক আন্দোলনের পেছনে অবশ্য পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী জর্জ সোরসের হাত দেখতে পাচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই আন্দোলনের লক্ষ্য হলো সরকারের বিরোধিতা করা। সরকারকে দুর্বল করে তোলা। সেজন্য জনমত সংগ্রহ করা। তরুণ প্রজন্মকে খেপিয়ে তোলা।
১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক মামলার শুনানিতে দেশের তরুণ সমাজের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। বলেছিলেন, এক শ্রেণির তরুণ রয়েছেন, যারা কোথাও কিছুই করতে পারেননি। কোনো পেশায় জায়গা করে নিতে পারেননি। কোনো কাজ জোগাড় করতে পারেননি। তাদের কেউ সাংবাদিক হয়েছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে গেছেন, কেউ আইন পেশায়, কেউ বা তথ্য জানার অধিকার আন্দোলনের কর্মী। সে তরুণদের তিনি ‘পরজীবী ও তেলাপোকা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
এর পরদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ককরোচ জনতা পার্টির জন্ম দেন অভিজিৎ দীপকে। ব্যঙ্গাত্মকধর্মী কণ্ঠস্বর হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন।




