কীভাবে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হলো হরমুজ প্রণালি

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ৪০ দিনের সংঘর্ষের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। সেটি হলো, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ক্ষমতা।
সংঘাতের শুরুর সময় থেকে অনেকেই এই যুদ্ধকে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নেতাদের লক্ষ্য করে চালানো হয় ব্যাপক বোমা হামলা।
এর জবাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তবে সংঘাত বাড়তে থাকলে ইরান তাদের কৌশল বদলে ফেলে।
তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। হরমুজ প্রণালি হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও যুক্ত করে আরব সাগরের সঙ্গে।
বিশ্বের বড় একটি অংশের তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। তাই এই প্রণালির ওপর দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ও বড় প্রভাব পড়ে রাজনীতিতে। ইরানের নতুন এই কৌশলের কারণে দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর সৃষ্টি হয় ব্যাপক চাপ। কারণ তাদের অর্থনীতি নির্ভর করে এই প্রণালি দিয়ে অব্যাহতভাবে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ওপর।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কর্মকর্তারা বুঝেছেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে প্রচলিত সামরিক সংঘাতের চেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা পাওয়া যাবে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলে ওয়াশিংটনকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে ইরান। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি আলোচনার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর দিতে হয়েছে অগ্রাধিকার।
ইরান নিয়মিতভাবে হুমকি দিয়ে এসেছে যে, তাদের ওপর আক্রমণ হলে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দেবে। তবে এর আগে কখনোই এটি করা হয়নি পুরোপুরি বন্ধ।
এমনকি ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, যখন তেলবাহী জাহাজে হামলা হয়েছিল, তখনও পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি এই প্রণালি।
বর্তমানে ইরানের কিছু সামরিক কমান্ডার ও কর্মকর্তারা এই প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে করছেন আলোচনা।
ইরানের পার্লামেন্ট, বিশেষ করে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন ইতোমধ্যে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের একটি দিয়েছে খসড়া প্রস্তাব।
বিজয়ের চিত্র
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যুদ্ধবিরতির পর বিজয়ের একটি চিত্র তুলে ধরে। কুয়েতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস থেকে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। যার শিরোনাম ছিল, ‘যখন আল্লাহর সাহায্যে সফলতা ও অর্জিত হয় বিজয়।’
এটি ইরানের ভেতরে প্রচারিত সেই বার্তাকেই তুলে ধরে, যেখানে বলা হচ্ছে যে, সফলভাবে প্রতিরোধ করতে পেরেছে দেশটি বিদেশি চাপকে।
‘ইরানের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, আর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা আছে’—বলছে আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ ফার্স নিউজ।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, এই যুদ্ধবিরতি ‘খামেনির মতবাদের’ বিজয়। এর মাধ্যমে মূলত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি যুদ্ধের শুরুর দিকে নিহত হন।
একই সময়ে, সাবেক আইআরজিসি প্রধান ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি বাহিনী এখনো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে এবং তাদের ‘আঙুল ট্রিগারে রয়েছে’। অর্থাৎ ইরানের সেনারা যেকোনো মুহূর্তে হামলার জন্য প্রস্তুত। তবে বিজয়ের এই বয়ানের আড়ালে প্রকৃত বাস্তবতা অনেক বেশি ভঙ্গুর।
ইরানের সামরিক বাহিনী উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকায় আরও খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে দেশটির অর্থনীতি।
সংঘাত চলাকালে অন্তত ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ছিল এবং বেশ কয়েকজন জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভ থেকে আটক হয়েছিল।
এই পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, দেশের ভেতরে ভিন্নমত নিয়ে সরকার গভীর উদ্বেগে রয়েছে, তাই তারা আবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
শান্তি আলোচনার আগে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান দাবি। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন সহজ ছিল না বলেই মনে হচ্ছে।
বুধবার ইরান সতর্ক করে যে, রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করবে, সেগুলোকে ‘লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং ধ্বংস করা হবে’।
পরে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানালেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ‘অগ্রহণযোগ্য’ প্রতিবেদনের বিষয়ে জেনেছেন, তবে তিনি বলেছেন, গোপনে বা ব্যক্তিগতভাবে যা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে এসব কথা মিলছে না।
‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেন সবাই নিরাপদে চলাচল করতে পারে সেই ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ইরান’—জানালেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ খাতিবজাদেহ।
তার ভাষ্য, এই প্রণালি হাজার বছর ধরে উন্মুক্ত ছিল, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়।
এই প্রণালি পুনরায় তখনই খুলে দেওয়া হবে, ‘যখন যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে এই আগ্রাসন বন্ধ করবে,’ যা সম্ভবত লেবাননে ইসরায়েলের হামলার দিকে ইঙ্গিত করে—যোগ করেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী।
খাতিবজাদে আরও বলেছেন, ইরান ‘আন্তর্জাতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইন’ মেনে চলবে, তবে তার মতে, এই প্রণালি আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং নিরাপদ চলাচল ‘ইরান ও ওমানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।’
প্রণালিটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যার লক্ষ্য বেসামরিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিপজ্জনক নজির
তাহলে ইরান এখন পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কী করতে পারে?
ইরানের পার্লামেন্টে প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে প্রস্তাবটি তোলা হয়েছে, তাতে মোট ৯টি ধারা রয়েছে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় বলা হয়েছে, ‘শত্রুপক্ষের জাহাজগুলোকে এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।’
বিকল্প হিসেবে ইরান নিজেই জাহাজ চলাচলের সব সেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ইরান বলেছে, এই পথে জাহাজ চালাতে হলে কোম্পানিগুলোকে সেই বাবদ অর্থ ইরানের মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে, ইরানের কোনো একটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রাখতে হবে, আর জাহাজগুলো কী ধরনের মালামাল বহন করছে, তা জানাতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রস্তাব এবং এখনো এ বিষয়ে ভোটগ্রহণ হয়নি।
যদি ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তাহলে মূল প্রশ্ন হবে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্ররা এই পদক্ষেপ মেনে নেবে কিনা।
সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে অনেক বিরোধিতা থাকবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা মনে করে সমুদ্রে স্বাধীনভাবে চলাচল করা তাদের একটি মৌলিক নীতি।
তাই এমন কোনো শুল্ক আরোপ হলে সেটা একটা বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে বলে মনে করা হবে।
যদি ইরান এতে সফল হয়, তাহলে একে একটি বড় কৌশলগত এবং প্রতীকী বিজয় হিসেবে দেখা হবে, যা প্রমাণ করবে যে তারা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তবে এখানেও অনেক বড় ঝুঁকিও আছে। এ ধরনের পদক্ষেপ উল্টো ফল দিতে পারে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ, ন্যাটোর সদস্য দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো একজোট হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত হয়ে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, এমনকি নিতে পারে সামরিক পদক্ষেপও।

