আর্মি-পুলিশ দিয়ে কি কিশোর অপরাধ দমন সম্ভব?

প্রতীকী ছবি
পুলিশ কিংবা আর্মি যেভাবে দেশের কিশোর অপরাধ দমনের চেষ্টা করছে তাতে সাময়িকভাবে ফল আসলেও দীর্ঘমেয়াদে কতটুকু কার্যকর হবে সেটি ভেবে সচেতন মহল সন্দিহান। অপরাধ দমন না করে অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শেষ পর্যন্ত কি সুফল মিলবে? কিশোর অপরাধ দমন করতে হলে দেশের শিশু কিশোর, বিশেষ করে নিম্নবিত্তের মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হবে।
কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শুধু পুলিশের কাজ নয়। সমাজকল্যাণ, শিশু, ক্রীড়া সব মন্ত্রণালয় মিলে সমন্বিত দীর্ঘ মেয়াদী উদ্যোগ নেয়া দরকার। শিশু জন্ম নিয়েই অপরাধী হয় না বা অপরাধী হয়ে জন্মায় না। অনেক সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতা পেরিয়ে একজন শিশু অপরাধী হয়ে ওঠে। ঢাকা শহরসহ সারাদেশে লাখ লাখ কিশোর একই রকম পরিবেশে বড় হয়ে উঠছে না। সাধারণত কিশোর অপরাধীদের দায় শহরের বস্তিবাসীদেরদেরকেই দেয়া হয়। কিন্তু অনেক ঘটনায় দেখা গেছে, অবস্থাসম্পন্ন ঘরের ছেলে, এমনকি মেয়েরাও উঠতি বয়সে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিপুল বিত্ত বৈভবও অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিউট শিশু ক্রমশ বাবা-মার জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই লেখায় ফোকাস করতে চাই কিশোর গ্যাং এবং নগরের কিশোর অপরাধীদের বিষয়ে।
ছিনতাই, খুন ঢাকা শহরে সবসময় ছিল। কিশোর গ্যাংও ছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পর থেকে অধিক আলোচনা শুরু হয়। ঢাকার মানুষের স্বাভাবিক ব্যস্ত জীবনে আতঙ্কের নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে কিশোর গ্যাং। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল মোহাম্মদপুর। তবে ধানমণ্ডিসহ অন্যান্য সকল এলাকাতেই কিশোর গ্যাং এর ভয়াবহ উপস্থিতি ছিল। মানুষ এমন সব দৃশ্য দেখেছে যে ভয়ে আতঙ্কে নিজের জীবন, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভেবে দিশেহারা হয়েছে। নাগরিক তার ঘরের দরজার সামনেই আক্রান্ত হয়েছে। ছিনতাই খুনের ঘটনা এখনো নিয়মিতই ঘটছে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শহরের একটি হল ঢাকা। পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা তিন কোটিরও কম। সেখানে পুঁচকে ঢাকা শহর ধারণ করছে তিন কোটিরও বেশি মানুষকে।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের শহর পুরোপুরি সুস্থ এবং বাসযোগ্য রাখা কি শুধু পুলিশের কাজ? পুলিশ কি এটা করতে পারবে বা পারছে? শিশু কীভাবে কেন অপরাধী হয়ে ওঠে? কী কী কারণে সে ছিনতাই এবং খুনের পথ বেছে নিচ্ছে? এই মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর তালাশ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা কি রাষ্ট্র নিচ্ছে? যে ভয়াবহ অমানবিক অবস্থায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিহারীদের রেখেছে সেখানে শতভাগ বিহারী মানুষ যে অপরাধী হয়ে যায়নি সেটাই তো আমাদের বড় পাওয়া।
রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্প নামের ভয়ংকর ঘিঞ্জি আর নোংরা স্থানে মানুষ গিজগিজ করে। ১৭ একর জায়গায় মাদক কারবারিই নাকি আছে এক হাজারেরও বেশি! ব্রিটিশ আমলে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট মুসলিম জাতীয়তাবাদের শক্তিতে ঢাকায় জন্ম নেওয়া মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে ভারতের বিহার রাজ্যের মুসলমানদের একটা অংশ নিকট পাকিস্তান ভেবে ঢাকায় চলে এসেছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতাপ্রাপ্ত হলে বিহারী জনগোষ্ঠী নিপতিত হয় দীর্ঘমেয়াদী সংকটে। এই বিহারীরা ভারত থেকে এখানে এসেছিল, পাকিস্তান থেকে নয়। স্বাধীন রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ছিল বিহারী-বাঙালি সবাই ভাই ভাই। সবাই সমান সুযোগ সুবিধা পাবে।
কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও ঢাকার বুকে কয়েক হাজার পরিবারের আজীবনের দীর্ঘশ্বাস হয়ে আছে এই জেনেভা ক্যাম্প। মৃত্যু ছাড়া যেন এই দীর্ঘশ্বাসের কোনো শেষ নেই! বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় কয়েক হাজার স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাটের প্রশস্ত বারান্দায় বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বিহারীদের কষ্টের এহসাস করা সম্ভব না।
এই শহরে শুধু বাঙালিরা ভাল থাকবে, বাঙালি আলিশান ভবনের মালিক হবে। বিহারী পরিচয়ের মানুষগুলোও তো এদেশের নাগরিক। এই বিহারী শিশুরা তো পাকিস্তান বা ভারতে জন্ম নিচ্ছে না। জেনেভা ক্যাম্পের মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। ছোট এতটুকু জায়গায় কেন এরা এভাবে মানবেতর জীবন যাপন করবে? একবার জন্মাবে, প্রতিদিন মরবে, প্রতি মুহূর্তে মরবে! এই মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে।
বিহারীরা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বন্দি দশায় সংখ্যায় বেড়ে চলেছে। জেনেভা ক্যাম্পকে এই অবস্থায় রেখে দিয়ে ঢাকা শহর কখনোই সুনিশ্চিত, চিরস্থায়ী শান্তিতে থাকতে পারবে না। পুলিশ, আর্মি দিয়ে কাজ হবে না। কিছু অপরাধী সাময়িক হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু অপরাধের সিলসিলা চলতেই থাকবে।
একবার বিহারী শিশুদেরকে এই অমানবিক পরিবেশ থেকে বের করে আনতে পারলে, তাদের জন্য সুস্থ সুন্দর জীবনের ব্যবস্থা করতে পারলে জেনেভা ক্যাম্পের শিশুরা আমাদের বাংলাদেশের সম্পদ হিসেবে আবির্ভূত হবে। ক্রিকেট, ফুটবলসহ সকল খেলাধুলায় বিহারী শিশুরা বিপ্লব ঘটাতে পারে। বিপ্লব ঘটাতে পারে টেকনিক্যাল লাইনে। সমান সুযোগ সুবিধা পেলে বিহারী শিশুরা দেশের সর্বক্ষেত্রে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে। নরকের পরিবেশে থেকেও শত শত বিহারী ছেলে-মেয়ে এই শহরে নানা হালাল পথে ইনকাম করে পরিবারের ভরণপোষণ করে চলেছে। রাষ্ট্র তাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে করুণা করবে না।
এটা তাদের অধিকার। বিহারী পরিবারের শিশু, কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে লেখা প্রতিটি কথা শহরের অন্যান্য বস্তির ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। একবার যদি শহরের হতদরিদ্র শিশু কিশোরদেরকে অমানবিক জীবন থেকে বের করে আনা যায়, তবে এই শহর সুস্থ হতে বেশিদিন সময় নিবে না।
কিন্তু প্রশ্ন হল কীভাবে করা সম্ভব এই কাজ? খুবই সাধারণ আবার খুব কঠিন সেই প্রক্রিয়া। বিচক্ষণ আমলারা বলতে পারেন তাদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, তারা সেখানেই পড়ালেখা করতে পারে। কিন্তু বিহারী এবং ঢাকার বস্তিবাসীদের সমস্যা আরও বেশি গভীরে নিহিত।
এই গভীর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংকট থেকে বস্তিবাসী শিশু-কিশোরদের বের করে আনার জন্য দরকার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী সরকারের ঐকান্তিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দরকার মানবসম্পদ উন্নয়নের মেগা প্রজেক্ট। শুধু ঢাকা শহরের বস্তিগুলোর ছেলে মেয়েদেরকে টার্গেট করে তাদেরকে দেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ বানানোর প্রকল্প হাতে নিতে হবে। সবার আগে বস্তিবাসীদের জন্য স্বাভাবিক বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। অমানবিক পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে হবে।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা করেছিল বিহারিদের জন্য কেরানীগঞ্জে সাড়ে ৫ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ হবে। ২০২৩ সালের ২০ জুন সংসদে জানানো হয় যে, সরকার মোহাম্মদপুরে বসবাসরত অবাঙালিদের পুনর্বাসনের জন্য কেরানীগঞ্জে ৫ হাজার ৬০০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব শহরে দরিদ্র কমিউনিটির ছিন্নমূল জনগণকে টেকসই উন্নয়নের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা ছিল বলেও সেদিন জানানো হয়। ছিন্নমূল জনগণকে বিস্তৃত পরিসরে আবাসন সুবিধা দিতে গাজীপুরস্থ টঙ্গির দত্তপাড়ায় ভাড়াভিত্তিক আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রথম পর্যায়ে ৪ হাজার ৩২টি ভাড়াভিত্তিক আবাসিক ফ্ল্যাট তৈরির প্রকল্প নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য যে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধিক্ষেত্রের আটটি অঞ্চলের এক হাজার ৫২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরে অবস্থিত। সাভার উপজেলার পুরোটাই রাজউকের আওতাধীন। রাজউকের আওতাধীন গাজীপুর সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকা বর্তমানে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন এলাকা হিসেবে বিবেচিত। তাই ওই এলাকা বাদ দিয়ে রাজউক অধিক্ষেত্র পুনঃনির্ধারণ করার পরিকল্পনা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। রাজধানীসহ প্রধান প্রধান শহরের বস্তিতে জীবিকার তাগিদে মানবেতরভাবে বসবাস করা প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে ভাড়াভিত্তিক ফ্ল্যাটে বসবাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছিল।
বলা বাহুল্য যে এসব পরিকল্পনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি শেষ পর্যন্ত। শহরের গরীব মানুষের জীবনে সহসা পরিবর্তন আনতে হলে রাষ্ট্রকে প্রচুর অর্থ এখানে বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু বাসস্থান নয়, বস্তির শিশুদের জন্য স্পেশালাইজড স্পোর্টস একাডেমি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। এইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার প্রধান যোগ্যতাই হবে বস্তির দরিদ্র মানুষ। সরকার যদি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অপচয় কমিয়ে উপরোক্ত উপায়ে বস্তির শিশুদের জন্য বিনিয়োগ করে, এই শহর নিঃসন্দেহে অধিকতর নিরাপদ এবং সুন্দর হবে।
যে শিশুদেরকে আজ আমরা অপরাধী হওয়ার জন্য খোলা ছেড়ে রেখেছি তারাই একদিন দেশের গর্ব হবে। হিউম্যান রিসোর্স হিসেবে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। বস্তিগুলোর মানবসম্পদ উন্নয়নের মেগা প্রজেক্ট নিতে পারলে বর্তমান সরকার দেশের ইতিহাসে গৌরবময় অংশীদার হিসেবে গণ্য হবে। শুধু পুলিশের পক্ষে অভিযান চালিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে মানবসম্পদ উন্নয়নের মধ্য দিয়ে। যদি সমাজকল্যাণ, শিশু, শিক্ষা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগ নেয় তবে বস্তিগুলোর মানবসম্পদ উন্নয়নের মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন সম্ভব।
লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

