যুদ্ধের ছায়াতেও চেনা ছন্দে জেদ্দা
- আতঙ্ক নয়, আস্থার কথা বলছেন বাসিন্দারা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের উত্তাপ। সৌদি আরবের অন্য শহরে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ। অথচ লোহিতসাগরের তীরে জেদ্দায় সকাল হচ্ছে চেনা ব্যস্ততায়। কর্মস্থলে ছুটছেন মানুষ। কলেজে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। পুরনো বাজারে ক্রেতার আনাগোনা। এমনকি সপ্তাহান্তে বন্ধুদের আড্ডাও থামেনি। অস্থিরতার মধ্যেও শহরের কয়েকজন বাসিন্দা ও পর্যটক বলছেন, তারা এখনো অনেকটাই নিরাপদ বোধ করছেন।
গত শুক্রবার সৌদি সংবাদমাধ্যম আরব নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জেদ্দার এই ছবি। ঐতিহাসিক আল-বালাদ, সমুদ্রতীরের কর্নিশ এবং তাহলিয়ার ব্যস্ত সড়কে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড চলতে দেখা যাচ্ছে। সৌদি নাগরিক আহলাম আলহিন্দি বলেছেন, ‘জেদ্দায় জীবন আগের মতোই চলছে। সবকিছু শান্ত ও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।’ তার কথায়, এখানে নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। খুব বেশি দুশ্চিন্তা না করে প্রতিদিনের কাজ করতে পারছেন বলে তিনি খুশি। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
আরেক বাসিন্দা রাওয়ান আলগামদি বলেছেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার পরামর্শ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাইহীন খবর নয়; নির্ভর করতে হবে সরকারি তথ্যের ওপর। সৌদি নাগরিক জেইনা আলফারুকির কাছেও পরিচিত দৈনন্দিন জীবন নিরাপত্তার অনুভূতি মনে করিয়ে দেয়।
জেদ্দায় শুধু সৌদি নাগরিকরা নন, বহু বিদেশিও দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। তাদের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে একই আস্থা। মিসরীয় ফায়েজ ইব্রাহিমের বয়স ৫২ বছর। তিন বছর বয়সে সৌদিতে এসেছেন। এখনো নিয়মিত কাজে যান, বাজার করেন। তিনি বলেছেন, ‘জীবনের প্রায় পুরোটাই এখানে কাটিয়েছি। সরকারের ওপর আমার আস্থা আছে।’ আঞ্চলিক সহিংসতার সাম্প্রতিক খবরে অবশ্য তার মন খারাপ হয়।
জেদ্দায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা পাকিস্তানি আহমদ নাদিমের কলেজে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করায় ব্যাঘাত ঘটেনি। ইন্দোনেশীয় নূর নুরতাসিঙ্গো জানিয়েছেন, পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ বোধ করছেন, নিয়মিত কাজেও যাচ্ছেন। বিদেশে থাকা বন্ধুরা খোঁজ নিলে তিনি নিজের অভিজ্ঞতাই জানিয়েছেন। মরক্কোর আসিয়া বুলাম সৌদি আরবকে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি মনে করেন। বাসিন্দা আহমেদ আলীও নিরাপত্তাব্যবস্থায় আস্থার কথা বলেছেন।
ওমরাহ পালন শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জেদ্দায় আসা খুররম সিদ্দিকীর চোখেও সপ্তাহান্তের পরিচিত দৃশ্য। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার যানজট তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তার ভাষায়, ‘শহর জুড়ে সপ্তাহান্তের আমেজ।’ সবকিছু আগের মতোই চলছে। তিনি মনে করেন, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোর একটিতে রয়েছেন। এখানকার বাসিন্দা ও অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি সরকারের ওপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
তবে জেদ্দার এই স্বস্তির পাশেই রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। সম্প্রতি রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে। ব্যাহত হয়েছে উড়োজাহাজ চলাচল। ব্রিটেনও সৌদি আরবে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত আস্থা আর আঞ্চলিক নিরাপত্তাঝুঁকি আলাদা করে দেখতে হবে।
যুদ্ধের খবর পৌঁছাচ্ছে ঘরে ঘরে। তবু জেদ্দার রাস্তায় মানুষ হাঁটছেন, দোকান খুলছেন, বন্ধুদের সঙ্গে বসছেন। অনিশ্চয়তার মধ্যেও বেঁচে থাকার এই চেনা ছন্দই শহরের মানুষের কাছে আপাতত সবচেয়ে বড় আশ্বাস।



