ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান, লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার

ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার কথা জানিয়েছে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী। ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত ভিডিও থেকে নেওয়া স্থিরচিত্র।
ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক অবস্থান ও অস্ত্রভান্ডার লক্ষ্য করে অভিযান অব্যাহত রেখেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশটির সরকারি বাহিনী। ‘ডন অব ইয়েমেন’ (ডন অব ইয়েমেন) নামের এই অভিযানে স্থলবাহিনীর অগ্রযাত্রার পাশাপাশি বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। দেশটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখল, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এ অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।
গত ৫ অক্টোবর ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বড় পরিসরে এই সামরিক অভিযান শুরু করে। অভিযানের প্রথম পর্যায়ে লোহিত সাগর উপকূল, মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনর্দখলের চেষ্টা করা হয়। সরকারি বাহিনীর দাবি, অভিযানে তারা বেশ কয়েকটি কৌশলগত অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় লড়াই অব্যাহত রয়েছে এবং উভয় পক্ষের সামরিক অগ্রগতির সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের অংশ হিসেবে সরকারি বাহিনী হুথিদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ১০৩টি লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে। এসব অভিযানে হুথিদের সামরিক অবস্থান, পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, অস্ত্রের গুদাম, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং রসদ সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সরকারি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এসব অভিযানে বিপুলসংখ্যক হুতি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন এবং সামরিক যান ও সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং এশিয়া-ইউরোপের সমুদ্রপথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫ অক্টোবর সরকারি বাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ধুবাব এলাকা এবং প্রণালির আশপাশের কয়েকটি অবস্থান দখলের দাবি করে। একই অভিযানে মোখা বন্দর শহরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার কথাও জানায় তারা। এসব অগ্রগতির ফলে লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য মোকাবিলায় সরকারি বাহিনীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
সরকারি বাহিনীর অভিযানের মধ্যেই ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় পাল্টাপাল্টি হামলা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। হুথিরাও সরকারি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। অন্যদিকে, সরকারি বাহিনী ও তাদের সমর্থক জোট হুতিদের সামরিক স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে, ১৫ অক্টোবর ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদ কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় পাঁচজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হন। ঘটনাটি সংঘাতের বিস্তার ও নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে হুথিরা। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাত কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালে নতুন করে লড়াই তীব্র হয়েছে।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার এবং রাজধানী সানাসহ হুতি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল পুনর্দখলের কথা জানিয়েছেন।
তবে সামরিক অভিযান কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে সরকারি বাহিনীর দখল করা এলাকাগুলো ধরে রাখা, সরবরাহপথ সচল রাখা এবং হুতিদের পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। একই সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নৌবাণিজ্যেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।



