যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় ‘কাবু’ ইরানের অর্থনীতির কী অবস্থা

তেহরানের একটি সবজি বাজারে কয়েকজন ক্রেতা। ফাইল ছবি / রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ প্রায় ছয় মাস হতে চলল। দীর্ঘ যুদ্ধের এ পর্যায়ে তেহরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এতে নতুন করে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে বেশ বেকায়দায় তেহরান সরকার। জনগণের পক্ষ থেকেও সংকট সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরদার হচ্ছে। এমনকি দেশটির শীর্ষ নেতারাও এখন মাঝেমধ্যে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা স্বীকার করছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সরকারকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, পণ্য ও সেবার দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো সমাধানের কথা বলেছেন।
এদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধের কারণে দেশটির আমদানি-রপ্তানি প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।
তবে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী সমঝোতা কার্যকর থাকার সময় ইরান প্রায় ৯ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রি করতে পেরেছিল।
হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুপক্ষের বনিবনা না হওয়ায় সমঝোতা ভেঙ্গে যায়। এরপর ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কর্মসূচি হাতে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সবশেষ অর্থনৈতিক চাপকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর ঐতিহাসিক জয়যাত্রার শুরুর দিন ডি-ডের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এরই মধ্যে ওয়াশিংটন বিভিন্ন দেশকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক কমানোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। তা না হলে এসব দেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে চীন ও ভারতের মতো ইরানের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের এখনো নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়নি। এমন পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
তবে মিসরের ব্যাংক মিসরকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসার কারণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। ব্যাংকটির সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাখাগুলোর ডলার লেনদেন সীমিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এর পাশাপাশি হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এবং ইরানের ব্যাংক মেল্লির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব এরই মধ্যে ইরানের অর্থনীতিতে স্পষ্ট। গত মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য পণ্য ও সেবার দাম দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে নতুন নিষেধাজ্ঞা যোগ হওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের জায়গা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হতো। প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি করছে ইরান। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, এটি খোলা রয়েছে।
তবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্য, ইরানের অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলাচল করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের পেতে রাখা সমুদ্রের মাইন সরিয়ে তারা প্রণালির কিছু অংশ পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
শুক্রবার প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৭। গত ১০ দিনের গড় ছিল ১৫টি।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। বৃহস্পতিবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি তেহরানে ইরানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের আগের মতো জাহাজ চলাচল ফেরানোর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি পরে ওই আলোচনা ‘গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটি কার্যকর করতে কাতার ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই সমঝোতার ফলে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধের কারণে তা ভেঙে যায়।
ফলে একদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক পথও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক সংকট একসঙ্গে চলতে থাকায় ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ছে এটা মোটামুটি স্পষ্ট।
সূত্র : রয়টার্স











