যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে বান্ডেল বান্ডেল টাকা

ধ্বংসস্তূপ থেকে টাকার বান্ডেল হাতে একজন উদ্ধারকমী। ছবি: এপি
ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধের গত পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ভয়াবহ দিন পার করল লেবানন। আজ বৃহস্পতিবার শোকাতুর ও বিধ্বস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে দেশটি।
রাজধানী বৈরুতসহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিতদের সন্ধান করতে দেখা গেছে উদ্ধারকর্মীদের। এসময় দেখা গেছে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের স্তূপ থেকে উদ্ধারকৃত টাকার বান্ডিল ব্যাগে ভরছেন একজন উদ্ধারকর্মী।
ইসরায়েলি হামলায় জীবনের পাশাপাশি শেষ সম্বলটুকুও হারিয়েছেন অনেকে। অ্যাসোসিয়েটে প্রেসের সাংবাদিক হুসেইন মাল্লার তোলা জায়নবাদীদের বর্বরতার এ চিত্র মনোযোগ কেড়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমের।
তাতেও অনুশোচনা নেই ইসরায়েলের, দিয়েছে আরও বড় হামলার হুঁশিয়ারি। জবাবে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ। লেবাননে হামলা চলতে থাকলে তার জন্য তেল আবিবকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তিনি দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধের জন্য ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার কোনো সতর্কতা ছাড়াই চালানো ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২০৩ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার দাবি করলেও, বেশ কিছু হামলা জনাকীর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় অফিস ছুটির ব্যস্ত সময়ে চালানো হয়েছে। ফলে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই হামলাকে ‘বর্বর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।বৃহস্পতিবারও দক্ষিণ লেবানন লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত ছিল। ইসরায়েল দাবি করেছে যে, তারা হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেমের সহকারী ও ভাগ্নে আলী ইউসুফ হারশিকে হত্যা করেছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।বৈরুতের ধ্বংসস্তূপের ধারে অপেক্ষায় থাকা মানুষের চোখেমুখে উদ্বেগ, ধুলোবালি থেকে বাঁচতে তারা মুখ ঢেকে রেখেছেন। ভবন ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের মাঝে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ওপর বসে আছেন ক্লান্ত ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র এলি খাইরুল্লাহ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, উপকূলীয় এলাকা আইন মরাইসেতে গত রাতে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক আহত নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ শহরতলির একটি ধসে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবন থেকে এক ব্যক্তিকে জীবিত পাওয়া গেছে।
ভেবেছিলাম আমি মারাই গেছি। হঠাৎ চোখেমুখে তীব্র আলোর ঝলকানি দেখলাম আর দেখলাম একজন মানুষ উড়ে এসে আমার পাশে আছড়ে পড়ল। সে মৃত ছিল
সিরিয়ার দেইর এল-জোর থেকে আসা মোহাম্মদ শেহাব জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে তার পরিবারের ১০ সদস্যের মধ্যে ৬ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। বাকিদের খোঁজে সারাদিন ধরে চলছে তল্লাশি।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বেঁচে ফেরা মানুষ ও চিকিৎসকরা বর্ণনা দিয়েছেন যুদ্ধের বিভীষিকার। বৈরুতের মাকাসেদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রবি কোশোকের ভাষায়, ‘ভেবেছিলাম আমি মারাই গেছি। হঠাৎ চোখেমুখে তীব্র আলোর ঝলকানি দেখলাম আর দেখলাম একজন মানুষ উড়ে এসে আমার পাশে আছড়ে পড়ল। সে মৃত ছিল।’ হামলার সময় কর্নিশ আল মাজরার বাণিজ্যিক এলাকায় ছিলেন তিনি।
ডা. ওয়ায়েল জারোশ জানান, বিস্ফোরণের মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে প্রায় ৭০ জন আহত রোগী আসেন। তাদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন এবং তিনজন আইসিইউসহ পাঁচজন এখনো চিকিৎসাধীন। ‘মানসিকভাবে আমরা ভেঙে পড়েছি। তবুও আমাদের প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে যাতে পরিবারের সদস্য ও আহতদের সেবা দিতে পারি,’ যোগ করেন তিনি।
হামলা চালানোর বার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ‘হামলা চলবে পূর্ণ শক্তি, নির্ভুলতা এবং সংকল্পের সঙ্গে।’ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, হিজবুল্লাহ সদস্যরা তাদের মূল ঘাঁটি দক্ষিণ লেবানন ও দাহিয়ে এলাকা ছেড়ে বেসামরিক এলাকায় মিশে গেছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এই হামলাকে আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইনের ‘চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। লেবানন এ নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি অভিযোগ দায়ের করবে। রাষ্ট্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও বৈধ বাহিনীর বাইরে অস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।















