অবৈধ বসতির প্রতিবাদ করায় ‘শাস্তি’
গাজা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে ব্রিটেনকে তাড়ানোর ছক ইসরায়েলের

স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের পর এবার ব্রিটেনকেও গাজা যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার কথা ভাবছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে সরব হওয়াই কি ‘অপরাধ’? স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের পর এবার ব্রিটেনকেও গাজা যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার কথা ভাবছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার। ব্রিটেন পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যেই এই পাল্টা ব্যবস্থার আলোচনা শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার (আইজিএসসি) থেকে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে ইসরায়েল সরকার। দক্ষিণ ইসরায়েলের কিরিয়াত গাতে অবস্থিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই বহুজাতিক কেন্দ্র গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, মানবিক সহায়তা সমন্বয় এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রায় ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা এর সঙ্গে যুক্ত।
আর ব্রিটেন এখানে কোনও প্রান্তিক অংশীদার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পর কেন্দ্রটিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিনিধিদল ব্রিটেনের। এমনকি কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা মার্কিন জেনারেলের ডেপুটিও একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা। ফলে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হলে তা শুধু কূটনৈতিক অপমান নয়, গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় লন্ডনের প্রভাব কমানোরও একটি বড় পদক্ষেপ হবে।
কেন ব্রিটেনের উপর ক্ষুব্ধ ইসরায়েল
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ই-১ বসতি প্রকল্প। ইসরায়েল সেখানে নতুন বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্রিটেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পূর্ব জেরুজালেম ও মা'আলে আদুমিমের মধ্যে ইসরায়েলি বসতির সংযোগ আরও শক্ত হবে এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমালোচকদের মতে, এতে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কার্যকর ভৌগোলিক ভিত্তিই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। বর্তমানে প্রায় সাত লাখ ইসরায়েলি পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের এসব বসতিতে বাস করেন। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর বসতি ও ফাঁড়ির সম্প্রসারণ আরও বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের উপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও হয়রানির অভিযোগও বাড়ছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম তার পূর্বসূরি কিয়ার স্টারমারের তুলনায় নেতানিয়াহু সরকারের নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতেই তিনি ইসরায়েল সরকারের উপর চাপ বাড়ানো, অস্ত্র রফতানিতে আরও বিধিনিষেধ এবং পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
ব্রিটেন এখন অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে। সাম্প্রতিক ব্রিটেন সরকারের ওয়েবসাইট 'ইউগভ' এর সমীক্ষায় ৫০ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক এমন নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেছেন, বিরোধিতা করেছেন মাত্র ১৬ শতাংশ।
স্পেনের পর নেদারল্যান্ডসকেও বের করে দিল ইসরায়েল
ব্রিটেনকে ঘিরে হুমকিটি যে নিছক কথার কথা নয়, তার উদাহরণ ইতিমধ্যেই রয়েছে। স্পেনকে আগেই গাজা সহায়তা কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। এরপর মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধিদেরও কেন্দ্র ছাড়ার নির্দেশ দেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা'আর। তাঁদের এক সপ্তাহের মধ্যে চলে যেতে বলা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস আগামী সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমির ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করছে। তারই পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ডাচ কর্মকর্তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।
সা'আর বলেছেন, নেতানিয়াহুর অনুমোদন নিয়েই সিদ্ধান্তটি হয়েছে। তার বার্তা ছিল, যেসব দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে, তাদের এই অঞ্চলে ভূমিকা রাখতে দেওয়া হবে না।
কিন্তু ইসরায়েলের চাপেও নতি স্বীকার করেনি নেদারল্যান্ডস। ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন জানিয়েছেন, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দুঃখজনক হলেও অবৈধ বসতির পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না। গাজার মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও নেদারল্যান্ডস কাজ চালিয়ে যাবে।
ব্রিটেনকে আরও ‘পাল্টা শাস্তি’র চিন্তা
ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বহিষ্কারই শেষ কথা নাও হতে পারে। ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, ব্রিটেন অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করলে আরও কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্পও নেতানিয়াহু সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা, তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কা করছেন। লন্ডন ও তেল আবিবের সম্পর্ক সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দ্রুত অবনতির দিকে গেছে৷ গাজায় মানবিক পরিস্থিতি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের জবাবদিহি নিয়ে দুই দেশের বিরোধ ক্রমেই প্রকাশ্যে এসেছে।
আমেরিকার অনুমতি লাগবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন
তবে ব্রিটেনকে সরানোর ক্ষমতা এককভাবে ইসরায়েলের আছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কারণ আইজিএসসি একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক কাঠামো। কেন্দ্রটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতির পর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেখানে প্রায় ২০০ মার্কিন সেনাও কাজ করছেন।
কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, ব্রিটেনের মতো বড় অংশীদারকে সরাতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর কাঠামোর সম্মতি প্রয়োজন হতে পারে। ইসরায়েলের অন্য কর্মকর্তাদের দাবি, কেন্দ্রটি ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হওয়ায় কে সেখানে থাকবে, সে বিষয়ে শেষ কথা বলার সার্বভৌম অধিকার তাদেরই।
আর এখানেই নেতানিয়াহু সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে। যে কেন্দ্রটির কাজ গাজার যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং পুনর্গঠনের আন্তর্জাতিক সমন্বয় করা, সেই কেন্দ্র থেকেই একের পর এক ইউরোপীয় দেশকে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে সরিয়ে দেওয়া হলে তার বহুজাতিক চরিত্রই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
স্পেন গেছে, নেদারল্যান্ডসকে যেতে বলা হয়েছে, এবার নিশানায় ব্রিটেন। জার্মানি ও ইতালির মতো দেশকেও সরানো হলে পশ্চিমা শক্তিগুলির মধ্যে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রই কেন্দ্রটির প্রধান শক্তি হিসেবে থেকে যাবে।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ যখন বাড়ছে, তখন সেই নীতির সমালোচনাকারী দেশগুলোকেই গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কেন্দ্র থেকে একে একে সরানোর পথে হাঁটছে ইসরায়েল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের আন্তর্জাতিক মঞ্চ কি এখন নেতানিয়াহু সরকারের কূটনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে উঠছে?







