ইরান-আমিরাত গোপন সমঝোতা কেন

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে প্রতিদিন নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছিল, তখন পর্দার আড়ালে চলছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই— কূটনীতির লড়াই। কয়েক সপ্তাহের সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং নিরাপত্তা সংকটের পর এবার সামনে এসেছে এমন এক সম্ভাব্য সমঝোতার খবর, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইরানের মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা হয়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, আমিরাতের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ রাখার বিনিময়ে তেহরানের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও আবুধাবি এসব দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত চলাকালে ইরান কয়েক সপ্তাহ ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে আমিরাতসহ বিভিন্ন মার্কিন মিত্র দেশের স্বার্থে আঘাত হেনেছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য আবুধাবি তেহরানের সঙ্গে নতুন ধরনের বোঝাপড়ার পথে এগোয়।
হামলা বন্ধের শর্তে ইরানকে টাকা দিচ্ছে আমিরাত
এই অর্থের উৎস আমিরাতের নিজস্ব তহবিল, নাকি আমিরাতি ব্যাংকিং সিস্টেমে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ইরানের কোনো ব্যাংক হিসাব থেকে এই অর্থ আসছে— সেটি নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার
বিষয়টি এমন একসময়ে সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী বৃহত্তর কূটনৈতিক দরকষাকষি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শিগগির একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হতে পারে। কূটনীতিকদের মতে, সেই আলোচনার অংশ হিসেবেই বিদেশি ব্যাংকগুলোয় আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়ের পথ খুলে যেতে পারে।
রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমিরাত মোট ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড় করতে সম্মত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ এরই মধ্যে তেহরানের হাতে পৌঁছেছে। তবে সমঝোতা সম্পর্কে অবগত আরও দুই কর্মকর্তা ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তাদের মতে, প্রকৃত অঙ্কটি ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আরব আমিরাতের ভূখণ্ডে ভবিষ্যতে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা না চালানোর নিশ্চয়তার বিনিময়েই এই অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থের উৎস নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। এটি আমিরাতের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে, নাকি দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ থেকেই ছাড় করা হচ্ছে— তা নিশ্চিত নয়।
এসব দাবিকে অবশ্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। গতকাল শনিবার ভোরে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৩ বিলিয়ন ডলার হস্তান্তরের খবরটি ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’। এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি তারা।
এর আগে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে আমিরাতের এক কর্মকর্তা বলেছেন, অঞ্চল জুড়ে উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং সংঘাতের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অঞ্চলকে রক্ষা করতে তারা কাজ করছে। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগসহ যেকোনো গঠনমূলক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে আবুধাবি।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনে এক বক্তব্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সই করলেই ইরান স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না। সম্ভাব্য চুক্তিটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে তেহরান তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেই শুধু সুবিধাগুলো কার্যকর হবে।
ইরানের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কর্মকর্তাদের কেউই বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
যদি এই সমঝোতার খবর সত্যি হয়, তাহলে তা ইরান-আমিরাত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা হবে। কারণ সাম্প্রতিক সংঘাতের বড় একটি সময় জুড়ে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ইরানি হামলার প্রভাবে দুবাইয়ের পর্যটন ও ব্যবসা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; বহু বিদেশি কর্মী ও ব্যবসায়ী দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে আমিরাতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে।


