হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধের হুমকি ইরানের, লাভবান হচ্ছে মার্কিন কোম্পানি

হরমুজ প্রণালির ওমান অংশের মুসান্দামে নোঙর করা কিছু জাহাজের ড্রোন ভিউ- রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের আইআরজিসি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। অন্যদিকে, রাশিয়ার তেল জায়ান্ট রোজনেফটের প্রধান নির্বাহী ইগোর সেচিন মন্তব্য করেছেন, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো।
আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স সরাসরি এই পাল্টা হামলা চালায়। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে অনুমতি ছাড়া ট্যাংকার চলাচল কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা সৃষ্টির হয়। এর জেরে কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। মূলত কুয়েত ও বাহরাইনের এই মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে সম্প্রতি কেশম দ্বীপ এবং সিরিকে আইআরজিসির যোগাযোগ টাওয়ারে মার্কিন ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। যার জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এক বিস্তারিত বিবৃতিতে আইআরজিসি পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানায়, রাত ১টা ৩০ মিনিটে চারটি তেলের ট্যাংকার তাদের নৌবাহিনীর সঙ্গে কোনো প্রকার সমন্বয় না করে এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করে। আইআরজিসির সতর্কবার্তার পর একটি ট্যাংকারে আঘাত করা হলে সেটি থেমে যায় এবং বাকি জাহাজগুলো ফিরে যায়।
এর ঠিক আধঘণ্টা পর, রাত ২টার দিকে মার্কিন ড্রোন কেশম ও সিরিক দ্বীপে আইআরজিসির দুটি যোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালায়। এর তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
বিবৃতিতে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, ‘এই ধরনের আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি হলে পাল্টা জবাব শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটকে মনে রাখতে হবে, তাদের তেল-গ্যাস রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলে তার সমস্ত পরিণতির দায় তাদেরই নিতে হবে।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে ইরান। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্য এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইগোর সেচিন বলেছেন, ‘হরমুজ বন্ধের ঘটনাটি আসলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের নিয়মকানুনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধার্থে পুনর্গঠন করার একটি চেষ্টা। ইরানকে লক্ষ্য করে এই অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা পুরো বিশ্বের ওপর উল্টো আঘাত হেনেছে। এর কৌশলগত ঝুঁকিগুলোকে খাটো করে দেখা হয়েছিল।’
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এই ঘনিষ্ঠ সহযোগী আরও বললেন, ‘এর মূল সুবিধাভোগী অবশ্যই মার্কিন কোম্পানিগুলো। যারা প্রতিযোগিতাহীন বাড়তি সুবিধা এবং চড়া মূল্যে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ পেয়েছে।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই উত্তেজনা চলতে থাকলে তেলের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা কমে যেতে পারে। বিকল্প জ্বালানির প্রতি মানুষের আগ্রহ আবার চাঙ্গা হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে মে মাসে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস খাত থেকে কর রাজস্ব গত বছরের তুলনায় ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৯৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়া দেশগুলোকে সহায়তার জন্য রাশিয়ার সমুদ্রবাহিত তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞার মাত্রাও কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।’
সেচিন মন্তব্য করেন, সুচিন্তিত রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে চীন এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে মালাক্কা, বাব আল-মান্দেব ও জিব্রাল্টারের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক রুটগুলোও এখন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি পূর্বাভাস দেন, যদি অদূর ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়, তবে বছরের শেষ নাগাদ তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৯৫ থেকে ৯৬ ডলারে থাকবে। আগামী এক বছরে তা কমে ৮০ থেকে ৮৫ ডলারে নামবে। ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ নাগাদ বাজার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।
বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ‘প্যান্ডোরার বাক্সের তলানিতে আর কী বাকি আছে?’ শীর্ষক এক বক্তব্যে সেচিন বলেছেন, বিশ্ব জুড়ে সংকট এখন পাহাড়সম। একদিকে ক্ষমতাধর দেশগুলোর সামরিক প্রতিযোগিতা আর অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি, অন্যদিকে সামনে আসছে বিদ্যুৎ, খাদ্য ও পানির তীব্র অভাব।
এ ছাড়া ওপেক প্লাস জোটের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি জানান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো জোট ছাড়ার কারণে গত ১০ বছরে এর উৎপাদন দৈনিক ৫৮ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কমে ৩৭ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। যা জোটের শক্তি হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ।





