রাস্তার পাশে খোরশেদের সোয়া লাখ তালগাছ

রাস্তার পাশে নিজের লাগানো গাছ পরিচর্যা করছেন খোরশেদ আলী
ঠাকুরগাঁওয়ের মেঠোপথ ধরে যখন অশীতিপর এক বৃদ্ধ তার লক্কড়ঝক্কড় মোটরসাইকেলে চড়ে ধুলো উড়িয়ে যান, তখন দূর থেকে তাকে চেনা দায়। কিন্তু তার পেছনে ঝোলানো বস্তাভর্তি তালের আঁটি আর পাশে বাঁধা জংধরা শাবলটিই বলে দেয় তিনি কোনো সাধারণ পথিক নন। এলাকাবাসী তাকে চেনেন। তিনি খোরশেদ আলী— এই জনপদের সাদামনের এক মানুষ, ‘সবুজের জাদুকর’।
সারা দেশে যেখানে নগরায়ণের করাত প্রতিনিয়ত সবুজের কলিজা চিড়ে ফেলছে, সেখানে খোরশেদ আলী এক ব্যতিক্রমী দ্রোহের নাম। ২০১৩ সালের এক বিকালে একটি বজ্রাঘাত যখন বাড়ির সামনের তালগাছটি নিজের বুক পেতে দিয়ে পুরো পরিবারকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল, সেদিনই বদলে গিয়েছিল এই গ্রাম্য চিকিৎসকের জীবন। সেই থেকে শুরু তার জীবনের নতুন অধ্যায়।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামের খোরশেদ আলী পৈতৃক পাঁচ বিঘা ফসলি জমি বিক্রি করে দিয়ে গড়ে তুলেছেন ১ লাখ ২৫ হাজার তালগাছের বিশাল জীবন্ত প্রাচীর, যা আজ সিপাইয়ের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জেলার দিগন্তবিস্তৃত পথে। এ বয়সেও তিনি প্রতিদিন মোটরসাইকেলে চড়ে ঠাকুরগাঁও সদর থেকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে বেড়ান, সড়কের পাশে লাগান গাছ, করেন গাছের পরিচর্যা।
‘লোকে আমাকে পাগল বলত, হাসাহাসি করত। কিন্তু আমি তো জানতাম আমি কী করছি। আমি তো শুধু বীজ পুঁতছি না, আমি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুরক্ষার বর্ম বুনছি’— প্রশান্তির হাসি হেসে বলছিলেন খোরশেদ আলী। আবেগজড়ানো কণ্ঠে আরও বললেন, ‘যদিও ২০১৩ সালের বজ্রপাতের ওই ঘটনার পর থেকেই গাছ লাগানো শুরু, কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কথা স্মরণ করে পরে আমি এক লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য ঠিক করি। এখন ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি গাছ লাগানো শেষ। আমি চাই, গাছগুলো বড় হয়ে বজ্রপাত নিজের মাথায় নিক, মানুষ যেন নিরাপদে থাকে।’
জেলায় নিজের লাগানো প্রতিটি তালগাছ খোরশেদ আলীর কাছে সন্তানের মতো। কোনো একটি চারা নষ্ট হলে বা কেউ কেটে ফেললে ভীষণ কষ্ট পান তিনি।
জমি বিক্রি করে রাস্তার পাশে খোরশেদ আলীর গাছ লাগানো পরিবার প্রথমে মেনে নিতে পারেনি। তারা তাকে থামাতে প্রশাসনের দ্বারস্থও হন। তার ছেলে আবদুর রহমান সেই স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘বাবা যখন জমি বিক্রি করে তালের আঁটি কিনতে শুরু করলেন, আমরা নিজেদের ভবিষ্যতের আর্থিক অনিশ্চয়তার শঙ্কায় থানায় নালিশ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আজ যখন রাস্তার দুই ধারে বাবার লাগানো গাছগুলো বাতাসের তালে দোলে, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে। এখন বুঝি, বাবা আমাদের জন্য জমি না রাখলেও পুরো জাতির জন্য এক বিশাল ছায়া রেখে যাচ্ছেন।’




