চোখের সামনে মুছে যাচ্ছে ফিলিস্তিন
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র-ব্যবসা বন্ধের ডাক শতাধিক কূটনীতিকের

শনিবার প্রকাশিত নজিরবিহীন যৌথ চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেছেন ৫২ জন সাবেক ফরাসি কূটনীতিক এবং ৫০ জন সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ও শীর্ষ কূটনীতিক।
শুধু ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। সেই রাষ্ট্রের অস্তিত্বই যদি মাটিতে মুছে দেওয়া হয়, তবে স্বীকৃতি থাকবে শুধু কাগজে। এমনই তীব্র সতর্কবার্তা দিলেন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের শতাধিক সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক। তাদের অভিযোগ, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের মাধ্যমে “বিশ্বের চোখের সামনেই ফিলিস্তিনকে মুছে দেওয়া হচ্ছে”। তা ঠেকাতে ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র ও সামরিক সহযোগিতা স্থগিত, বাণিজ্যচুক্তি আটকে দেওয়া এবং অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসা নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
শনিবার প্রকাশিত নজিরবিহীন যৌথ চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেছেন ৫২ জন সাবেক ফরাসি কূটনীতিক এবং ৫০ জন সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ও শীর্ষ কূটনীতিক। তাদের অনেকেই কর্মজীবনে ইসরায়েল, মিসর, ইরান, সিরিয়া, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও তুরস্কের মতো দেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘে ব্রিটেনের সাবেক দুই প্রতিনিধি জেরেমি গ্রিনস্টক ও এমির জোনস প্যারি, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক এডওয়ার্ড চ্যাপলিন। ফরাসিদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক প্যাট্রিস পাওলি এবং জেরুজালেমে সাবেক কনসাল জেনারেল স্তানিসলাস দ্য লাবুলায়ে। অর্থাৎ এটি বর্তমান সরকারের কোনও বিবৃতি নয়; দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা সাবেক কূটনীতিকদের সম্মিলিত আবেদন।
চিঠির ভাষা কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রচলিত সীমা ছাড়িয়েছে। সাবেক কূটনীতিকদের অভিযোগ, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ভাঙা, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ভূমি দখলের ঘটনাগুলি ‘জাতিগত নির্মূলের’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গাজায় প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে বিধ্বস্ত ভূখণ্ডের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে; খাদ্য, ওষুধ ও বাসস্থানের সংকটও অব্যাহত, এমন দাবি করেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ছিল জঘন্য অপরাধ, কিন্তু সেটি গাজা ও তার জনগণের উপর পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞকে ন্যায্যতা দেয় না।
আরও কঠিন অভিযোগ উঠেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের নীতির লক্ষ্য কার্যত একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাই শেষ করে দেওয়া। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সিদ্ধান্ত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একের পর এক প্রস্তাব এবং আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। সাবেক কূটনীতিকদের ভাষায়, অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোনও রাষ্ট্র নিজেকে প্রকৃত গণতন্ত্র দাবি করতে পারে না।
সাত দফায় চাপ বাড়ানোর দাবি
শুধু নিন্দাতেই থামেননি তারা। লন্ডন ও প্যারিসের সামনে সাতটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপও রেখেছেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পাশাপাশি ইইউ-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি এবং ব্রিটেন-ইসরায়েল বাণিজ্য ও অংশীদারত্ব চুক্তি স্থগিতের দাবি করা হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র আমদানি-রপ্তানি এবং দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতাও বন্ধ করতে বলেছেন তারা।
গাজায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ, অন্য জাতিসংঘ সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ত্রাণসংস্থাগুলোকে অবাধে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ দিতে ইসরায়েলের উপর চাপ তৈরির আহ্বানও রয়েছে। সাংবাদিক, কূটনীতিক ও আইনপ্রণেতাদের গাজায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন তারা। নির্দেশ না মানলে তার পরিণতি থাকতে হবে, এমন দাবিও করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে পণ্য, বিনিয়োগ, বিমা ও আর্থিক পরিষেবাসহ সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন সাবেক কূটনীতিকেরা। ব্রিটিশ বা ফরাসি নাগরিকদের অধিকৃত ফিলিস্তিনি জমিতে সম্পত্তি কেনাও ফৌজদারি অপরাধ করার দাবি তাঁদের। যে সব দাতব্য প্রতিষ্ঠান বসতি সম্প্রসারণে অর্থ দেয়, তাদের কর-সুবিধা বা দাতব্য মর্যাদা প্রত্যাহারের কথাও চিঠিতে বলা হয়েছে।
এই নজিরবিহীন আবেদনের ঠিক আগে পশ্চিম তীরের বিতর্কিত ‘ই-১’ প্রকল্পে ১,২০০টির বেশি বসতি নির্মাণের দরপত্র প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা ভেঙে পূর্ব জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনি অঞ্চল আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের। ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশ ওই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি অবৈধ, এই অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে তারা।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ই-১ প্রকল্পকে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের জন্য ‘ধ্বংসাত্মক’ হুমকি বলে বর্ণনা করেছেন। লন্ডনে ইসরায়েলের শীর্ষ কূটনৈতিক প্রতিনিধিকেও তলব করা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞাসহ একটি বিস্তৃত পদক্ষেপের প্যাকেজ সামনে আনা হবে।
ইসরায়েল অবশ্য বসতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আপত্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার বলেছেন, ইহুদিদের ইসরায়েলের সর্বত্র বসবাসের অধিকার রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক চাপের সামনে ইসরায়েল নিষ্ক্রিয় থাকবে না।
তবে সাবেক কূটনীতিকদের চিঠি একতরফা ভাবে শুধু ইসরায়েলকেই কাঠগড়ায় তোলেনি। ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকেও সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, গাজা ও পশ্চিম তীরকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ভাবে আবার একত্রিত করতে হবে। বর্তমান ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে ‘অপ্রতিনিধিত্বশীল ও অকার্যকর’ আখ্যা দিয়ে নভেম্বরে নির্ধারিত নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ব্রিটেন ও ফ্রান্স দু’দেশই ২০২৫ সালে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷ কিন্তু সাবেক কূটনীতিকদের বক্তব্য, স্বীকৃতির সেই সিদ্ধান্তকে এখন বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। কারণ তাদের চোখে মূল সংকটটি আর ভবিষ্যতের কোনও সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সীমানা নিয়ে নয়, রাষ্ট্রটি আদৌ মাটিতে টিকে থাকার মতো ভূখণ্ড পাবে কি না, প্রশ্ন এখন সেটিই।
ইসরায়েলের লন্ডন দূতাবাসের কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হলেও চিঠি প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গাজায় ধ্বংসস্তূপ, পশ্চিম তীরে বসতির বিস্তার এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা–সব মিলিয়েই শতাধিক সাবেক কূটনীতিকের সতর্কবার্তা তাই একটি বাক্যে এসে ঠেকেছে: ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্র হিসেবে; এখন সেই রাষ্ট্রের জন্য জমিটুকুই যদি না থাকে, তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মূল্য কতটা থাকবে?






