হঠাৎ কেন তুরস্ককে ‘শত্রু’ হিসেবে সামনে আনছেন নেতানিয়াহু

১৭ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে তেল আবিবের প্রধান সড়কে বিশেষ বিলবোর্ডটি দেখা গেছে। ছবি : রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে তুরস্ককে। রাজধানী তেল আবিবের প্রধান সড়কের পাশে বিশাল একটি বিলবোর্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে চিহ্নিত করা হয়েছে ইসরায়েলের শত্রু হিসেবে। একই ছবিতে ইরান, হিজবুল্লাহর নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও রাখা হয়েছে। সেখানে লেখা, ‘তারা নেতানিয়াহুকে হারাতে চায়। তাদের জিততে দেবেন না।’
এ বিলবোর্ড টানানোর কয়েক দিন পরই ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান উত্তর সিরিয়ার আবু আল-দাহার বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, সেখানে তুরস্ক সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, ইসরায়েল এটিকে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে।
তবে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই মাসের কিছুটা বেশি বাকি থাকায় এ হামলার সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারের মধ্যে এই হামলা হওয়ায় ইসরায়েল ও বিদেশের অনেকেই জানতে চাইছেন, নেতানিয়াহু কি সত্যিই বড় কোনো কৌশলগত হুমকি ঠেকাতে হামলা চালিয়েছেন, নাকি আসন্ন নির্বাচনে সুবিধা পেতে হুমকিটিকে বড় করে দেখাচ্ছেন?
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তিনিই সবচেয়ে সক্ষম। একই সঙ্গে সংকটকে রাজনৈতিক সুবিধায় কাজে লাগানোরও তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক এ হামলার সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ বলেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমন সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন যে ইসরায়েল হয়তো তুরস্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি দিচ্ছে। তার মতে, নির্বাচন সামনে রেখে এমন পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুর জন্য লাভজনক হতে পারে।
ইসরায়েল অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নেতানিয়াহু ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলছেন, তুরস্ক সিরিয়ায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল—এমন গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েলের হাতে ছিল।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, বিমান ঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। ইসরায়েলের দাবি, এমন পদক্ষেপ সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের স্বাধীনতা কমে যেতে পারে। এতে ওই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যও বদলে যেতে পারে।
এরই মধ্যে রবিবার ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যান জর্ডানে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে বৈঠক করেন। সাম্প্রতিক সময়ের উত্তেজনা কমাতেই এই বৈঠক হয়েছে বলে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা জানিয়েছে।
তবে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং নেতানিয়াহুর কয়েকজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হামলার সময় নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছেন; তেমনি তুরস্ক ইসরায়েলের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অহেতুক উত্তেজনা তৈরির অভিযোগ করেছে। একই সঙ্গে সিরিয়ার সঙ্গে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে আঙ্কারা।
নেতানিয়াহু ও কাৎজ হামলার পেছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধির অভিযোগ নাকচ করেছেন। নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি তৈরি হয়ে ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে উঠুক, আমরা তা মেনে নেব না।’
এর পাশাপাশি এরদোয়ানের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। শুক্রবার নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এরদোয়ানকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ বলে উল্লেখ করে। একই সঙ্গে তার নিজের দেশের জনগণের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও করা হয়।
নেতানিয়াহু ও এরদোয়ানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে। গাজা, লেবানন ও ইরানের যুদ্ধের সময় তা আরও বেড়েছে।
এরদোয়ান নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী বলেছেন এবং গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ করেছেন। নেতানিয়াহু পাল্টা এরদোয়ানের বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ করেছেন।
সম্প্রতি তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়ার বিরোধিতাও করেছেন নেতানিয়াহু। তিনি এরদোয়ানের ‘আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে সতর্ক করেছেন।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হ্যারেলের মতে, হামলার পেছনে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক—দুই কারণই থাকতে পারে। তার ভাষ্য, এরদোয়ানের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান সত্যিই উদ্বেগের কারণ। সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক তৎপরতার তথ্যও ইসরায়েলের কাছে রয়েছে।
তবে হ্যারেল মনে করেন, নেতানিয়াহু একই সঙ্গে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের হামলার পর তার কৌশল হলো সম্ভাব্য সব ফ্রন্টে আগে হামলা চালানো এবং সীমান্তে নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করা। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় এমন বিষয় দেখা যাচ্ছে।
তবে হামলার সময় এবং নির্বাচন সামনে থাকায় নেতানিয়াহুর সমালোচকদের সন্দেহ আরও বেড়েছে।
ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ হামলাটিকে প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করলেও পরে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োজন হলে হামলা চালানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হামলা চালানোর পর চুপ থাকা উচিত।’
বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান হামলাটিকে ‘উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক’ বলেছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক আরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার মতে, নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক উত্তেজনা তৈরি করে জনগণকে আতঙ্কিত করার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের স্পষ্ট গন্ধ রয়েছে।
বর্তমানে জনমত জরিপে নেতানিয়াহু ও তার জোট পিছিয়ে রয়েছে। তাই সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। এতে নির্বাচনী প্রচারের মূল আলোচনাও নেতানিয়াহুর নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে।
বিশ্লেষক হ্যারেলের মতে, নেতানিয়াহু মনে করেন, বড় কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে নির্বাচনের হিসাব বদলে যেতে পারে এবং তার রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার সুযোগ বাড়তে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে। গাজা ও লেবাননেও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার ওপর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও সিরিয়া ইসরায়েলের জন্য নতুন একটি সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। আর এ কারণেই হামলার পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল কি না, সেই সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
সূত্র : সিএনএন










